রাজবাড়ীতে গুদামে জমাট বাঁধছে ইউরিয়া, ‘সংকট’ ডিএপি সারের 

মইনুল হক মৃধা, রাজবাড়ী
১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০০:০২আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০০:০২

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে কৃষকের চাহিদা কম থাকায় ডিলারদের গুদামে দীর্ঘদিন পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ইউরিয়া সার। এতে তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের প্রচুর চাহিদা থাকলেও প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরা বলছেন, তাদের দরকার ডিএপি, কিন্তু তা কম পাওয়া যাচ্ছে। উল্টো ইউরিয়া সার বেশি থাকলেও তাতে চাহিদা নেই তাদের। 

কৃষক ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খানিকটা উঁচু এলাকা হওয়ায় গোয়ালন্দ উপজেলায় রবি মৌসুম শুরু হয়েছে গত অক্টোবর মাস থেকে। যা আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকবে। এ অঞ্চলের কৃষকরা সবজি, মাছের খামার, কলাবাগানসহ নানা ধরনের ফসলের আবাদে ডিএপি সার বেশি ব্যবহার করছেন। 

কৃষকরা বলছেন, জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগের পর কার্যকারিতা থাকে সর্বোচ্চ ১০ দিন। এই সারে থাকে শুধু নাইট্রোজেন। সেখানে ডিএপি সারের কার্যকারিতা থাকে অন্তত তিন মাস। এই সারের মধ্যে ইউরিয়া ও টিএসপির সংমিশ্রণ থাকে। এটি ব্যবহারের জন্য বলছে কৃষি বিভাগও। এজন্য এতে আগ্রহ বেশি তাদের।

উপজেলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) নিযুক্ত ডিলাররা বলছেন, কৃষকের চাহিদা বিবেচনায় গত সেপ্টেম্বর মাসে উপজেলার পাঁচ জন বিসিআইসি ডিলারের জন্য ৫০০ মেট্রিক টন এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চার ডিলারের জন্য ২০০ মেট্রিক টন ডিএপি সারের চাহিদা জানিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে আবেদন করেন। বিষয়টি অক্টোবর মাসের জেলা সার ও বিজ মনিটরিং সভায় আলোচনা ও রেজুলেশনভুক্ত করা হয়। কিন্তু অক্টোবর মাসে তাদের চাহিদা অনুযায়ী সার না দিয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের নয় ডিলারকে সমবণ্টন করে সর্বমোট মাত্র ২১২ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন ডিএপি সার বরাদ্দ দেয়। ঘাটতি মেটাতে আশপাশের কম চাহিদা সম্পন্ন উপজেলা থেকে এনে বিক্রির অনুমতি চাইলেও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাড়া দেননি। তারপর থেকে ডিএপির সংকট চলছে। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে কোনও কোনও বিক্রেতা বেশি দামে ডিএপি বিক্রি করছেন। কিন্তু তার দায়ভারও বিসিআইসি ডিলারদের ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে। প্রয়োজন না থাকলেও তাদের পাঁচ জন বিসিআইসি ডিলারকে প্রতি মাসে মোট ২৭৭ মেট্রিক টন করে ইউরিয়া সার দেওয়া হচ্ছে। এর অন্তত ৩০ শতাংশ সার অবিক্রীত অবস্থায় থেকে প্রতি মাসে গুদামে পড়েকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

গোয়ালন্দ বাজারের বিসিআইসি ডিলার মেসার্স নুরুজ্জামান মিয়ার স্বত্বাধিকারী হোসেন জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নভেম্বর মাসে বরাদ্দ পাওয়া ১২৪০ বস্তার মধ্যে ৯৮৪ বস্তা অবিক্রীত পড়ে আছে।’

একই কথা বলেছেন মেসার্স হোসেন আলী ব্যাপারীর প্রতিনিধি (ছেলে) ওহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নভেম্বর মাসে আমার ইউরিয়ার সরবরাহ ছিল ৬২ মেট্রিক টন। বিক্রি বাদে এখনও ৭০০ বস্তা গুদামে পড়ে রয়েছে। সেগুলো জমাট বেঁধে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

মেসার্স সপ্তবর্ণা ট্রেডার্সের প্রতিনিধি প্রণব কুমার দাস বলেন, ‘গত চার মাসে আমাদের গুদামে ৭৬ বস্তা অবিক্রীত ইউরিয়া সার জমাট বেঁধে নষ্ট হয়ে গেছে। খুচরা হিসাবে ১৩২৫ টাকা বস্তা দরে এতে আমাদের লোকসান হয়েছে লক্ষাধিক টাকা।’

মেসার্স স্বপন কুমার সাহা ডিলারের স্বত্বাধিকারী পলাশ কুমার সাহা বলেন, ‘ইউরিয়ার সরকারি ডিলার মূল্য ১২৫০ টাকা বস্তা। সাব ডিলারদের কাছে আমাদের ১৩২৫ টাকা বস্তা বিক্রি করার কথা। কিন্তু গুদামে থেকে নষ্ট হওয়ার ভয়ে বিক্রি করছি ১২৮০ টাকা করে। অথচ ডিএপির ব্যাপক চাহিদা থাকলেও দিতে পারছি না।’

ডিলাররা জানান, এভাবে প্রত্যেক ডিলারের ঘরেই ইউরিয়া সার অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে নতুন করে আবার ডিসেম্বরের জন্য ডিলার প্রতি ১১২০ বস্তা করে ৫৬০০ বস্তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন। প্রতি মাসে বরাদ্দকৃত সার না তুললে তাদের লাইসেন্স বাতিলেরও ঝুঁকি আছে।

এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রায়হানুল হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উপজেলায় আবাদি জমি ও তাতে সার ব্যবহারের নির্দিষ্ট পরিমাণ হিসাব করে সরকার বিভিন্ন ধরনের সার বরাদ্দ দিয়ে থাকে। গোয়ালন্দের অনেক কৃষক কৃষি বিভাগের অনুমোদিত পরিমাণের চাইতে বেশি ডিএপি সার ব্যবহার করেন। যে কারণে এখানে ডিএপির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে কৃষকদের আরও সচেতন হতে হবে।’

ডিএপি সার সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলায় ডিএপি সারের কোনও ঘাটতি নেই। সারের চাহিদা উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে নেওয়া হয়। গোয়ালন্দে ডিএপির ঘাটতির বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিলারের গুদামে পড়ে থাকা ইউরিয়া সার চলমান রবি মৌসুমে শেষ হয়ে যাবে আশা করছি।’

/এএম/
সম্পর্কিত
স্মার্ট কার্ডধারী কৃষকদের জন্য বড় সুখবর দিলো বাংলাদেশ ব্যাংক
‘ঋণ পরিশোধ করমু নাকি সংসার চালামু, এই চিন্তায় ঘুম আয় না’
মাঠে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে ২ কৃষকের মৃত্যু  
সর্বশেষ খবর
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করছে জাতীয় সংসদ: স্পিকার
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী