সরকারি ‘এক বীজে’ নানা জাতের ধান, কিছু পেকেছে কিছু কাঁচা

বিজয় রায় খোকা, কিশোরগঞ্জ
১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০১ আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০১

কিশোরগঞ্জের হাওরে কয়েকদিন পরই শুরু হবে বোরো ধান কাটা। হাওরজুড়ে এখন চলছে ধান কাটার প্রস্তুতি। তবে যেসব কৃষক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ব্রি-ধান ৮৮ জাত চাষ করেছেন, তারা পড়েছেন বিপাকে। তাদের ক্ষেতে এক জাতের ধান হয়নি, নানা জাতের ধান দেখা যাচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসির এক জাতের ধানের বীজে নানা জাতের ধান ধরায় কোনোটি পেকে গেছে, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনোটির শীষ বের হয়নি। এ অবস্থায় কীভাবে ধান কাটবেন ভেবে পাচ্ছেন না কৃষকরা। পাকা ধান কাটার চেষ্টা করলে নষ্ট হবে আধাপাকা ধান। আবার আধাপাকার জন্য অপেক্ষা করলে ঝরে যাচ্ছে পাকাগুলো। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা।

ইটনা ও করিমগঞ্জের কয়েকটি হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষে দেখা দিয়েছে এমন অস্বাভাবিকতা। আরও কিছু এলাকা থেকেও এমন খবর আসছে। তবে সেখানকার অবস্থা এমন শোচনীয় নয়। এ অবস্থায় কৃষকরা তাদের ফসল একসঙ্গে কাটতে পারবেন না। কৃষকদের অভিযোগ, বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-ধান ৮৮-এর বীজে মিশ্রণের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। এক জাতের বলে বীজ দিলেও আসলে তা নানা জাতের ধান। 

করিমগঞ্জের বড় হাওরে সরেজমিনে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে নিজের ক্ষেতের পাশে বসে ছিলেন গুণধর ইউনিয়নের মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান (৫০)। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৩ কানি জমিতে বিএডিসির-৮৮ ধানের বীজ লাগিয়েছিলাম। বীজ ধান তো শুরুতে চেনা যায় না। এখন আমার ক্ষেতের অর্ধেকেও ৮৮ ধান নেই। নানা জাতের ধান হয়েছে। কোনোটি পেকে গেছে, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনোটির শীষ বের হয়নি। এখন কীভাবে ধান কাটবো। ধার করে চাষ করেছি। আশা করেছিলাম, ৪০০ মণ ধান হবে। এখন ১০০ মণ হয় কিনা সন্দেহ। এখন আমার এই ক্ষতিপূরণ কে দেবো।’ 

কোনোটি পেকে গেছে, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনোটির শীষ বের হয়নি

সেখানে কথা হয় কৃষক ওমর সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি জানান, ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। এটি কৃষি বিভাগের প্রদর্শনীর ক্ষেত। এখানেও একই অবস্থা। এই ক্ষেতে বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে। তিন-চার ধরনের ধান দেখা যাচ্ছে।

বড় হাওরের কৃষক আক্তার মিয়া ও জমির উদ্দিনেরও একই অভিযোগ। তারা জানান, যারা ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সবার ক্ষেতেই মিশ্রণ ঢুকে গেছে। ফলে প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যারা ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন, তাদের পথে বসতে হবে। কারণ সব ধান একসঙ্গে কাটা যাবে না, বেশিরভাগই নষ্ট হবে।     

কৃষকরা জানান, বিএডিসির ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজে ছিল নানা ধানের মিশ্রণ। এ কারণে ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধান হয়েছে ক্ষেতে। পাকছেও একেক সময়ে। ক্ষেতের এই অস্বাভাবিক চিত্র দেখে দিশেহারা তারা। কৃষি ও বীজ অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনও সমাধান পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বলছেন, বিএডিসি চাষিদের মানসম্মত বীজ সরবরাহের কথা থাকলেও তাদের বীজে ভেজাল ছিল। এখন ভেজালের খেসারত গুনছেন কৃষক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এবার পুরো জেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে প্রায় ১৯ হাজার হেক্টরে। ইটনা ও করিমগঞ্জের বেশ কিছু হাওরে এই জাতের অস্বাভাবিক ফলন দেখা গেছে। কৃষি বিভাগ বিষয়টির খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাঠপর্যায় থেকে সমস্যাটি শুনে কৃষি কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠিয়েছি। তারাও ব্রি-ধান ৮৮-এর বীজে মিশ্রণের বিষয়টি দেখেছেন। ওসব ক্ষেতে কিছু ধান পেকেছে, কিছু ধান আধাপাকা আবার কিছু ধান কাঁচা। এর মানে বিভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ ছিল বিএডিসির বীজের প্যাকেটে। এখন কতটুকু জমি বা কতজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেই তালিকা করা হচ্ছে। আর আমরা বিএডিসিকেও বিষয়টি জানিয়েছি। এতে বোরো ফলনে সার্বিকভাবে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। তবে ব্যক্তিপর্যায়ে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’ 

পাকা ধান কাটার চেষ্টা করলে নষ্ট হবে আধাপাকা ধান

বিএডিসির বীজকেন্দ্র বলছে, বোরো চাষের জন্য মৌসুমের শুরুতে এবার প্রায় ৩৭০ মেট্রিক টন ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজ সরবরাহ করেছে বিএডিসি। পরে আরও ৩১৮ মেট্রিক টন বীজ সরবরাহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, উৎস থেকে তাদের কাছে বীজ আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিক কোথায় সমস্যাটি হয়েছে, কোথা থেকে এই বীজ এলো, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক  (বীজ বিপণন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরাও মাঠপর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি কোথায় থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেলো। কোনও ডিলার যদি বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবো। আর কোন উৎস থেকে এমন মিশ্রণযুক্ত বীজ এলো, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ 

বিএডিসির কিশোরগঞ্জের আরেক উপপরিচালক (বীজ উৎপাদন) হারুনুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ন্যাচারাল মিউটেশনের কারণে একই ফসলের মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, বেশি বয়সের চারা রোপণ কিংবা বীজের উৎসে ত্রুটি থাকলেও এমন হতে পারে।’ 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
সূর্যের আলোয় সেচ, কমছে কৃষকের খরচ বাড়ছে আয়
তেলের দাম বাড়ায় জমিতে সেচ দিতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে
হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে কি এবার চাষ হবে না?
সর্বশেষ খবর
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সারাদেশে আনসার-ভিডিপির আগাম প্রস্তুতি
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সারাদেশে আনসার-ভিডিপির আগাম প্রস্তুতি
বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি চায় আমিরাত
বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি চায় আমিরাত
নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সুপারিশ
নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সুপারিশ
দেশের সব শহরে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ চলছে: গণপূর্তমন্ত্রী
দেশের সব শহরে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ চলছে: গণপূর্তমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
দুই অ্যাকাউন্টে জমা আছে ১১ কোটি টাকা, এক লাখও দিতে পারছে না ব্যাংকটি
দুই অ্যাকাউন্টে জমা আছে ১১ কোটি টাকা, এক লাখও দিতে পারছে না ব্যাংকটি
একদিন ছুটি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি
একদিন ছুটি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি
অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় ঢুকে ৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করলো পুলিশ
অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় ঢুকে ৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করলো পুলিশ
মাঝরাতে আগুনে পুড়লো ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলসহ ২০ দোকান
মাঝরাতে আগুনে পুড়লো ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলসহ ২০ দোকান
বিদায়ী ম্যাচে হলুদ ও লাল কার্ড পেলেন মেসি
বিদায়ী ম্যাচে হলুদ ও লাল কার্ড পেলেন মেসি