শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রেখে নাগরিকদের জন্য একটি শান্ত ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন। এখন থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া জেলার কোনও সরকারি গাড়িতে হর্ন বাজানো হবে না।
বুধবার (২৯ জুলাই) বেলা ১১টায় গাজীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) নূরুল করিম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভাওয়াল সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সূচনার বক্তব্যে জেলা প্রশাসক শব্দদূষণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করেন। জেলা প্রশাসনের লক্ষ্য— জেলার সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা।
সভায় শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রচলিত আইনের বিধান নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ও প্রাসঙ্গিক ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। একইসঙ্গে শব্দদূষণ মুক্ত গাজীপুর গড়ার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসকের এই সময়োপযোগী উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং তা বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।
জেলা প্রশাসক তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, হর্ন না বাজিয়ে নিরাপদে গাড়ি চালানো সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে তিনি নিজেই তার সরকারি গাড়ি নিয়ে গাজীপুরের বিভিন্ন সড়ক ও ঢাকায় টানা ৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। এতে যাত্রাপথে কোনও ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি।
উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরাও জেলা প্রশাসনের এই কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানান এবং বাস্তবায়নের সুবিধার্থে বিভিন্ন গঠনমূলক প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।
আলোচনার এক পর্যায়ে জেলা প্রশাসক বলেন, হিসাব অনুযায়ী গাজীপুর জেলায় প্রায় দুই হাজার সরকারি গাড়ি রয়েছে, যা বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবামূলক কাজে ব্যবহৃত হয়।
এরপর তিনি উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে আমার গাড়িতে আর অযথা হর্ন বাজাব না। আপনারা কি নিজ নিজ গাড়ির ক্ষেত্রে এই অঙ্গীকার করতে প্রস্তুত?
জেলা প্রশাসকের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত সব কর্মকর্তা সমর্থন জানান এবং জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া অধীনস্থ সব সরকারি যানবাহনে হর্ন না বাজানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, অত্যন্ত জরুরি মুহূর্তে কখন ও কোথায় হর্ন ব্যবহার করা যাবে, তার একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে দ্রুতই সব দফতরে পৌঁছে দেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের মতে, অহেতুক হর্ন বাজানোর ফলে প্রতিদিন শহরাঞ্চলে শব্দদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এর ফলে শিক্ষার্থী, রোগী, প্রবীণ জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ নাগরিকেরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই সর্বসাধারণের মাঝে সচেতনতা তৈরিতে সরকারি যানবাহন থেকেই উদাহরণ সৃষ্টির এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরকারি ও আধাসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রধান প্রধান সড়ক ও মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একটি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ সময় বাস, লেগুনা, সিএনজি ও অটোরিকশা চালকদের আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে পুরো গাজীপুর নগরীকে হর্নমুক্ত করার লক্ষ্যে সতর্কতামূলক বার্তা দেওয়া হয়।
প্রথম ধাপে গাজীপুরের সরকারি গাড়িগুলোকে হর্নমুক্ত রাখার মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির সূচনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার প্রতিটি যানবাহনকে এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে বলে জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়।
মতবিনিময় সভার গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১২ সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ৭০ ডেসিবেলের অধিক শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির স্থায়ী ক্ষতিসাধন করতে পারে। উচ্চশব্দ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, মানসিক অস্থিরতা এবং শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সার্বিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জেলা প্রশাসন এই বিশেষ শব্দদূষণ বিরোধী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।









