টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাসাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর কবির। দুপুরে বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে শাহ আলমকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার শাহ আলম (৪৪) রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া এলাকার মৃত নবুর উদ্দিনের ছেলে।
একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিকালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক তিনটি অফিস আদেশ ও চিঠির মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এলজিইডি জানিয়েছে, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে থানায় একটি মামলা হয়েছে।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। মামলার প্রধান আসামি ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও অপর আসামি সাব-ঠিকাদার শাহ আলম।
এদিকে, মঙ্গলবার বিকালে সেতুটি পরিদর্শনে আসেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক।
ঘটনার তদন্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে একদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা প্রকৌশল অধিদফতর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিশসহ রেকটিফিকেশন করণ ও গাফিলতির জন্য উপ-সহকারী মো. মনিরুজ্জামানকে কৈফিয়ৎ তলব করা হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর (বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়ক) ৯০ দশমিক শূন্য ৬ মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের একটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া কাজটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে ২০ শতাংশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ববিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা মোবাইল ফোনে কাজটির ভিডিও ধারণ করে। স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর আবার রাতে কাজ শুরু করে ঢালাই শেষ করা হয়। পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
এলজিইডির অফিস আদেশে বলা হয়, নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করায় সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য একটি চিঠিতে সেতুটিতে কোনও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়।
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, ‘ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর এবং সহকারী ঠিকাদার শাহ আলম তাদের অনুপস্থিতিতে রাতে কাউকে না জানিয়ে ওয়াকওয়ে ও ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেন। বিষয়টিকে ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে। ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাসাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর কবির বলেন, ‘মামলায় দুজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধান আসামি এসএম জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’









