মেশিনের যুগেও টিকে আছে হাতের তৈরি শাড়ি, চাহিদা আছে বিদেশেও

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩০ আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩০

তাঁতের শাড়ির জন্য টাঙ্গাইলের পরিচিতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে সফট সিল্ক, কটন, জামদানি, রেশম, দোতারিসহ নানা নকশার হাতে বোনা শাড়ি দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। বিশেষ ধরনের উৎকৃষ্ট মানের সুতা ও দক্ষ কারিগরের হাতে তৈরি এসব শাড়ি পরতে যেমন আরামদায়ক, তেমনি নকশা ও বুননেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য।

ঐতিহ্যবাহী এ তাঁতশিল্পের ইতিহাস প্রায় দেড়শত বছরের। টাঙ্গাইলের পাথরাইল, চন্ডী, বাজিতপুর ও পুটিয়াজানি গ্রামের তাঁতপল্লিগুলোতে এখনও দিন-রাত চলে শাড়ি বোনার কাজ। ঈদ, দুর্গাপূজা ও পয়লা বৈশাখকে ঘিরে শাড়ির চাহিদা বাড়লেও কয়েক বছর ধরে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মজুরি সংকট, পাওয়ারলুমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, মূলধনের অভাব ও বাজার মন্দার কারণে বিপাকে পড়েছেন তাঁতিরা। অনেকেই বংশ-পরম্পরার এ পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

প্রবাদ রয়েছে, ‘নদী-চর খাল-বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন।’ আবার স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত, ‘চমচম, টমটম ও শাড়ি—এই তিনে টাঙ্গাইল বাড়ি।’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁতের খটখট শব্দে বেড়ে ওঠা কারিগরদের হাতেই তৈরি হচ্ছে ঐতিহ্যের এই শাড়ি।

যেভাবে বিস্তার

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে টাঙ্গাইলে তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে। বসাক সম্প্রদায়ের লোকজনই টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি। ঢাকা ও ধামরাই ছিল তাদের আদি নিবাস। পরে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় তাঁতশিল্প বিস্তার লাভ করে।

টাঙ্গাইল শাড়ির নকশায় নতুনত্ব আনার ক্ষেত্রে বাজিতপুরের আনন্দ মোহন বসাক, সীতানাথ বসাক, চন্ডী গ্রামের নীল কমল বসাক, মন্টু, নলসুন্দা গ্রামের হরেন্দ্র বসাক, পাথরাইলের রঘুনাথ বসাক, আনন্দ, গোবিন্দ, সুকুমার বসাক ও খুশি মোহন বসাকসহ অনেক কারিগরের অবদান রয়েছে।

তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িতরা জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ি বুননের পদ্ধতি অন্য শাড়ির তুলনায় আলাদা। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও কারিগরি জ্ঞান ছাড়া এ শাড়ির আসল বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। একজন তাঁতিকে শুধু কারিগর হলেই হয় না, তাকে শিল্পী হয়ে উঠতে হয়। টাঙ্গাইলে সেই দক্ষ শিল্পী-তাঁতিরাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

চার গ্রামের তাঁতপল্লিতে এখনও চলছে বুনন

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডী, বাজিতপুর ও পুটিয়াজানি গ্রামেই ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি তৈরি হয়। এসব গ্রাম থেকে সুতি জামদানি, সফট সিল্ক, ধানসিঁড়ি, বালুচরি, গ্যাসসিল্ক, স্বর্ণকাতান, দোতারি, চোষা ও রেশমসহ নানা ধরনের শাড়ি তৈরি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।

সরেজমিন পাথরাইলের তাঁতপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁতের খটখট শব্দে মুখর পুরো এলাকা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত শাড়ি বুননে ব্যস্ত কারিগররা। কেউ সুতা প্রস্তুত করছেন, কেউ তাঁতে বসে শাড়ি বুনছেন। বাড়ির ভেতরেই অনেক পরিবার তাঁত বসিয়ে এ কাজ করে।

মেশিনের যুগেও টিকে আছে হাতের তৈরি শাড়ি, চাহিদা আছে বিদেশেও

শাড়ি ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে প্রায় ১০ হাজার তাঁতি কাপড় বোনার সঙ্গে যুক্ত। বেশিরভাগ বাড়িতে পাঁচটি করে তাঁত রয়েছে। কোথাও ছয়টি, কোথাও আবার ১০টি পর্যন্ত তাঁত রয়েছে।

কমেছে মজুরি, বাড়ছে পেশা ছাড়ার প্রবণতা

তাঁতিরা জানান, একটি শাড়ি তৈরিতে মান ও নকশাভেদে সাত দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। আবার কোনও কোনও বিশেষ শাড়ি তৈরিতে দুই থেকে ছয় মাসও সময় লাগে। অথচ সময়ের সঙ্গে কমেছে মজুরি।

তাঁত শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে সপ্তাহে তিনটি শাড়ি তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু এখন সপ্তাহে চারটি শাড়ি তৈরি করছি। মজুরি কম থাকায় নতুন করে কেউ এ কাজে আসতে চায় না। ধান কাটতে একদিনে মজুরি পাওয়া যায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তবু ধান কাটার শ্রমিকের সমান মজুরি পাওয়া যায় না। আমাদের মজুরি বাড়ানো হলে পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে চলতে পারতাম।’

তাঁত শ্রমিক নারায়ণ চন্দ্র বলেন, ‘২৩ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত আছি। প্রতি পিস শাড়িতে ৬০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। সপ্তাহে ৫টি শাড়ি তৈরি করছি। এতে আমাদের পোষায় না। কম মজুরি দিয়ে সংসার চালানো দুরূহ হয়ে উঠেছে। আগের মতো জমজমাট নেই তাঁতপল্লি। তবু বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছি আমরা।’

কাঁচামালের দাম বাড়ায় বিপাকে ব্যবসায়ীরা

শাড়ি বিক্রেতারা জানান, কয়েক বছর আগেও একটি শাড়ি তৈরিতে যেখানে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে ৬০০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। কাঁচামালের দাম যে হারে বেড়েছে, সে অনুযায়ী শাড়ির দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমেছে।

ক্রেতারাও জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ির মান ভালো এবং অন্যান্য অনেক শাড়ির তুলনায় দামও কম। তবে আগের তুলনায় দাম বেড়ে যাওয়ায় শাড়ি কেনার পরিমাণ কমেছে। ঈদ, পয়লা বৈশাখ ও পূজা ছাড়া এখন অনেকেই নিয়মিত শাড়ি কেনেন না।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ঈদ, দুর্গাপূজা ও পয়লা বৈশাখে বিক্রি বাড়ে। তবে পাওয়ারলুমের তৈরি শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হ্যান্ডলুমের শাড়ি অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে।

বিদেশে বাড়ছে চাহিদা

শাড়ি ডিজাইনার ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নীল কমল বসাক বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মাঝেও ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ির মান ধরে রাখতে টাঙ্গাইল শাড়িতে আনা হয়েছে বাহারি ডিজাইন আর নতুনত্ব। দেশে শাড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় শাড়ি উৎপাদন ও বিক্রি কমে গেছে। তবে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, সৌদি আরব, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’

মেশিনের যুগেও টিকে আছে হাতের তৈরি শাড়ি, চাহিদা আছে বিদেশেও

তিনি বলেন, ‘সরকারি সহায়তা পেলে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এ শাড়ি রফতানি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকার অর্জন করতে পারে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তবে দেশে শাড়ির ব্যবসা এভাবে খারাপ চলতে থাকলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’

বছরে ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা

টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, ‘নববর্ষ, ঈদ ও পূজার সময় প্রতি বছর বিভিন্ন ডিজাইনের তাঁতের শাড়ি তৈরি করা হয়। এর মধ্যে সিল্ক, বিখ্যাত জামদানি, সফট সিল্ক, দোতারি, রেশম ও তসর অন্যতম।’

তিনি জানান, সিল্ক শাড়ি সাড়ে ৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা, নেট জুট সাড়ে ১০ হাজার, বাহার শাড়ি সাড়ে ১৬ হাজার, কটন জুট আড়াই হাজার এবং টিস্যু সিল্ক সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়।

রঘুনাথ বসাক আরও বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয় টাঙ্গাইলের শাড়ির। নানা কারণে গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় থেকে শাড়ির ব্যবসা কমে গেছে। মূলধন, প্রয়োজনীয় উপকরণের সমস্যা, নকশা ও প্রযুক্তিগত সমস্যা, দক্ষতার অভাব, বিপণনসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তাঁতি সম্প্রদায়।’

করটিয়া হাটে পাইকারদের ভিড়

টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির অন্যতম বড় বাজার করটিয়া হাট। প্রতি মঙ্গলবার এ হাটে তাঁতজাত পণ্য কিনতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা আসেন। তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি বিভিন্ন ডিজাইনের কাপড় কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা।

সরকারি সহায়তার আশ্বাস

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, ‘ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি। এ পণ্যটি প্রচার ও প্রসারে জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে তাঁত বুনন যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে কয়েদিদের প্রশিক্ষণের জন্য। যেন তারা জেলখানা থেকে বের হয়ে তাঁতভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হাতে বোনা টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি বিশ্ববাজারে স্থান করে নেবে এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকবে।’

তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, ঐতিহ্যপূর্ণ কারিগরি জ্ঞান ও নিষ্ঠা ছাড়া আসল টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি সম্ভব নয়। অথচ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, কম মজুরি, বাজার সংকট ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় প্রান্তিক তাঁতিরা ধীরে ধীরে পেশা ছাড়ছেন। তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্বজুড়ে খ্যাত টাঙ্গাইলের এই ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ভবিষ্যতে বড় সংকটে পড়তে পারে।

/এফআর/
সম্পর্কিত
স্বাধীনতার ১৬ বছর আগেই ঢাকায় টেস্ট! জানেন সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের গল্প?
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
এ যেন অন্য এক মিরপুর-১০, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
সর্বশেষ খবর
‘অল্প অল্প কিনে কোনোমতে জীবিন চালাচ্ছি’
সবজির বাজারে আগুন ‘অল্প অল্প কিনে কোনোমতে জীবিন চালাচ্ছি’
সুদানে ড্রোন হামলায় চার শিশুসহ ২৬ নারী নিহত
সুদানে ড্রোন হামলায় চার শিশুসহ ২৬ নারী নিহত
শীতের স্টকহোমে মোমের আলোয় স্পা, সনাস্নান আর বরফশীতল জলে ডুব
শীতের স্টকহোমে মোমের আলোয় স্পা, সনাস্নান আর বরফশীতল জলে ডুব
ক্ষমতায় এসেই জলাশয় দখলমুক্ত করেছে বিএনপি: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী
ক্ষমতায় এসেই জলাশয় দখলমুক্ত করেছে বিএনপি: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
এ যেন অন্য এক মিরপুর-১০, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
এ যেন অন্য এক মিরপুর-১০, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক