একসময় হাওরের জলে জালে ধরা পড়তো নানা প্রজাতির দেশি মাছ। ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা ও জাল নিয়ে হাওরে ছুটতেন জেলেরা। দিনভর মাছ ধরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেন মাছভরা নৌকা নিয়ে। সেই মাছ বিক্রির আয়েই চলতো সংসার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে হাওরের চিত্র। কমেছে মাছ, কমেছে জেলেদের আয়। জীবিকার তাগিদে অনেকেই ছেড়েছেন বাপ-দাদার পেশা, কেউ পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকায়, কেউ নেমেছেন দিনমজুরিতে, আবার কেউ রিকশা চালিয়ে চালাচ্ছেন সংসার।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার হাওর অধ্যুষিত চং নোয়াগাঁও গ্রামের চিত্র যেন এই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। একসময় গ্রামটিতে শতাধিক জেলে পরিবারের বসবাস ছিল। হাওরের মাছ ধরেই চলত তাদের জীবন-জীবিকা। এখন কোনোমতে টিকে আছে ২০ থেকে ২৫টি জেলে পরিবার। মাছের সংকটের পাশাপাশি জলমহাল ইজারা ব্যবস্থার কারণে হাওরে মাছ ধরতে গিয়েও নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
জেলেদের অভিযোগ, জলমহাল ইজারাদারদের টাকা না দিয়ে অনেক জায়গায় জাল ফেলার সুযোগ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, অবৈধ চায়না দুয়ারি ও রিং জাল, ব্যাটারিচালিত বিদ্যুতের সাহায্যে মাছ ধরা, কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার এবং নদী-খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে হাওরের দেশি মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য।
এর প্রভাব পড়েছে হাওরপাড়ের ঐতিহ্যবাহী বালিখলা পাইকারি মাছের বাজারেও। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হতো, এখন সেখানে লেনদেন নেমে এসেছে ৫০ লাখ টাকারও নিচে। ব্যবসায়ীদের দাবি, একসময় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রায় ১৬০ প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া গেলেও এখন অনেক প্রজাতির মাছই দুর্লভ হয়ে পড়েছে। এখন ৫০ প্রজাতির মাছও নেই।
যেসব কারণে হাওরে মাছের আকাল
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাওরাঞ্চলে কারেন্ট জাল এবং চায়না দুয়ারি জালের মতো নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই জালগুলোর সূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে ছোট-বড় সব সাইজের মাছ, এমনকি ডিম্বাকৃতির পোনা মাছও ধরা পড়ে যায়, যা মাছের বংশবৃদ্ধির চক্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ইলেক্ট্রিক ফিশিং ও ক্ষতিকর পদ্ধতি
অনেক অসাধু ব্যক্তি হাওরের বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাটারি বা জেনারেটরের মাধ্যমে পানিতে বৈদ্যুতিক শখ (ইলেক্ট্রিক ফিশিং) দিয়ে মাছ শিকার করছে। এর ফলে শুধু মাছই মরছে না, পানির নিচের জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র অণুজীবও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
জলমহাল অব্যবস্থাপনা ও নদী দখল
হাওরের বিভিন্ন নদী, খাল এবং প্রাকৃতিক জলাশয় বা জলমহালগুলোর ইজারা ও ব্যবস্থাপনায় চরম অনিয়ম দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদী ও খাল দখল করে নিচ্ছেন এবং মাছের প্রজনন মৌসুমেও মা-মাছ শিকার করা হচ্ছে।
পরিবেশ ও পানি দূষণ
কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং বিভিন্ন উৎস থেকে আসা বর্জ্যের কারণে হাওরের পানি দূষিত হচ্ছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে পাট পচানো বা পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য পানিতে মেশার কারণে পানির অক্সিজেন কমে গিয়ে এবং অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে অনেক সময় মাছের মড়ক দেখা দেয়।
নাব্যতা হ্রাস ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া
নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় এবং পলি জমার কারণে শুষ্ক মৌসুমে হাওরের বিল ও খালগুলো দ্রুত শুকিয়ে যায়। ফলে মাছের প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল বা অভয়াশ্রমগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন
এ ছাড়া সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং অসময়ে বন্যা বা খরা দেখা দেওয়ার কারণে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এই তীব্র সংকটের কারণে স্থানীয় মৎস্যজীবী বা জেলেরা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং অনেকেই তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন শহরে চলে যাচ্ছেন।
মাছ ধরতে গেলেও দিতে হয় টাকা
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার চং নোয়াগাঁও গ্রামের জেলে সুধাংশু দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে একশোর বেশি পরিবার আমরা একলগে (একসঙ্গে) থাকতাম। অহন আছে ১০ থেইক্যা (থেকে) ২০টি পরিবার। আমরা ঝালোরা (জেলেরা) হাওরের পানিতে মাছ ধরতে পারি না, যারা ইজারা আনছে (এনেছে) হেরারে (তাদের) টেহা (টাকা) দেওন (দিতে) লাগে। যারা টেহা দিতে পারে, শুধু হেরাই মাছ ধরতারে (ধরতে পারে)।’
জীবিকার এমন সংকটে কীভাবে টিকে থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে সুধাংশুর মতো জেলেদের। বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও এখন সেই পেশায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
মিঠামইন উপজেলার গোপদিঘী জেলেপল্লির রাখাল দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নদী যারা ইজারা আনে, হেরা (তারা) টেহা ছাড়া আমরারে (আমাদের) জাল ফেলতে দেয় না। টেহা লাগে ১৫ থেইক্যা (থেকে) ২০ লাখ। আমরা গরিব মানুষ, অতো টেহা কই পামু? টাকা জোগাড়ও করতে পারি না, ইজারাও আনতে পারি না। তাই আমরার অনেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মাটিকাটাসহ বিভিন্ন কাজ করে খাই।’
রাখাল দাসের অভিযোগ, জলমহাল ইজারা নেওয়ার সময় তাদের জেলে সমিতির নাম ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থাকে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে।
নিকলী উপজেলার দামপাড়া জেলেপল্লির পরিমল বর্মণ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইজারাদারদের টাকা দিয়ে জাল ফেললে আমাদের পোষায় না। দৈনিক জমা দিতে হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। মাছ পাওয়া যায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার। এতে সংসার চলে না।’
তিনি জানান, কেউ কেউ সাত-আটজন মিলে ইজারাদারদের সঙ্গে চুক্তিতে মাছ ধরেন। তাদেরও প্রতি সপ্তাহে, ১৫ দিন পরপর কিংবা মাস শেষে টাকা পরিশোধ করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাছ কমে যাওয়ার সমস্যা। সব মিলিয়ে জেলে পরিবারগুলো চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চান তারা।
বালিখলা বাজারে মাছের সরবরাহ কমেছে
জেলার প্রায় দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার হাওরাঞ্চলে মাছের সংকটের প্রভাব পড়েছে বালিখলা পাইকারি মাছের বাজারে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কয়েক বছর আগেও প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হতো এই বাজারে। বর্তমানে তা ৫০ লাখ টাকারও নিচে নেমে এসেছে।
বাজারের মাছ ব্যবসায়ী এনামুল মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে যেসব মাছ পাওয়া যেতো, তা বিলুপ্তির পথে। চিংড়ি, বাতাই, টাকি, মহাশোল, গজার, কাজরী মাছ আগে প্রচুর পাওয়া যেত। এখন নেই বললেই চলে, খুব কম। আগে একটা মাছ খুব দেখতাম—রাণী মাছ। এটা এখন আর চোখেই দেখি না।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের চায়না জাল ও রিং জালের কারণে দেশি মাছের অনেক প্রজাতি হারিয়ে যেতে বসেছে। এসব জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশি মিঠাপানির মাছের বড় সংকট দেখা দিতে পারে।’
বাজারের আরেক মাছ ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বালিখলা বাজারে আগে হাওরের বড় চিংড়ি প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার কেজি আসতো। এখন ১০০ কেজিও আসে না।’
তার অভিযোগ, চায়না দুয়ারি জালের পাশাপাশি কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশকও হাওরের মাছের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে দেশি মাছ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
মাছের প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত, বাড়ছে হুমকি
হাওরের মিঠাপানির মাছ বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় হাওর, বিল, খাল ও নদীতে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেতো। কিন্তু জলাশয় ভরাট, প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরার কারণে এসব মাছের প্রাপ্যতা কমছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত বিদ্যুতের সাহায্যে মাছ ধরা জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। অন্যদিকে, কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক, বৃষ্টির পানি ও কৃষিজমির পানি গড়িয়ে হাওরে মিশলে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি হয়। অনেক মাছ দ্রুত মরেও যায়। এ ছাড়া চায়না দুয়ারি ও রিং জালের মতো সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে মাছের পোনা ও ছোট মাছও ধরা পড়ছে। এতে মাছের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
জলমহাল ইজারা ব্যবস্থাও স্থানীয় জেলেদের জীবিকায় প্রভাব ফেলছে। ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে দরিদ্র জেলেদের অনেকেই জলমহালে মাছ ধরতে অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে তাদের অভিযোগ। ইজারা নেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করছেন। ফলে মাছের সংকটের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়ার পথে জেলেপল্লির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যও।
খনন ও সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ
এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাওরের জলাশয়গুলো একসময় মাছের প্রাচুর্যে ভরা ছিল। কিন্তু ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সেই প্রাচুর্য কমেছে। নদী, খাল, বিলসহ বিভিন্ন জলাশয় খননের জন্য ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জেলেরা যাতে সহজে জলমহাল ইজারা নিতে পারেন এবং “জাল যার, জলা তার” নীতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যায়, সে বিষয়েও কাজ চলছে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তাদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা আয়োজনের জন্য প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় জলাশয় খনন, মাছের পোনা নিধন বন্ধ এবং জেলেদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা না গেলে হাওরের মৎস্যসম্পদ রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে।
বছরে উৎপাদন ২৯ হাজার ৩২৪ মেট্রিক টন
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের হাওর ও নদ-নদী থেকে প্রতি বছর ২৯ হাজার ৩২৪ মেট্রিক টন দেশি প্রজাতির মাছ উৎপাদিত হয়। এই উৎপাদন স্থানীয় চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করে।
তবে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, জলমহাল ইজারা নিয়ে জেলেদের সংকট এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের অবক্ষয়ের অভিযোগ হাওরের মৎস্যসম্পদ ও এর ওপর নির্ভরশীল মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
চং নোয়াগাঁওয়ের জেলেপল্লিতে এখন আগের মতো নৌকার সারি নেই, নেই মাছভরা নৌকা নিয়ে ঘরে ফেরার সেই দৃশ্যও। একসময় যে হাওর ছিল শতাধিক পরিবারের জীবিকার ভরসা, আজ সেখানে টিকে থাকার লড়াই করছেন মাত্র ২০ থেকে ২৫টি পরিবার। মাছের সংকটের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের পৈতৃক পেশা, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের পরিচিত জগত।