নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ ২৭ এপ্রিল বুধবার। নানা নাটকীয়তার পর ঘটনার প্রধান আসামি নূর হোসেন ও র্যাবের চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তাসহ ২৩ জনকে গ্রেফতারের পর চলছে বিচার কার্যক্রম। তবে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে নিহতদের পরিবারে।
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নূর হোসেন ও অন্য আসামিদের নানা আচরণে ভীত হয়ে পড়েছেন মামলার সাক্ষীরা। ভয়ের আরেক কারণ সাত খুনের ঘটনায় আসামিপক্ষে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা, যারা পেশায় আইনজীবী। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নানা ধরনের হুমকিও পাচ্ছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।
তবে মামলার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে এগুচ্ছে দাবি করে নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে অভিন্ন মামলায় ৩০ জনের সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে অল্প সময়েই সব সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন করা যাবে।
তবে মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির পক্ষের আইনজীবী জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, চার্জশিট ত্রুটিপূর্ণ। মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ বা রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে আমরা উচ্চ আদালতে আবেদন করেছিলাম। উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন তদন্তকারী সংস্থা আরও অধিকতর তদন্ত করতে পারেন। কিন্তু সেটাও আমলে নেয়নি তদন্তকারী সংস্থা। ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট দিয়েই বিচার শুরু হয়েছে যাতে আসামি পক্ষের অনেক সুযোগ থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় যদি সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে উপস্থিত না করানো যায় তাহলে মামলায় আসামি পক্ষের সুবিধা হবে।
বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, নূর হোসেন দেশে আসার পর থেকেই সাক্ষী ও নিহত স্বজনদের ওপর হুমকি চলছে। অনেকেই আর এই সাত খুন নিয়ে কথা বলতে চান না। কেউ আর চায় না নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে। সবার মধ্যে নূর হোসেন এখন আতঙ্কের নাম। বাদী ও বাদীর আত্মীয় স্বজন এবং এ মামলার যারা আত্মীয় স্বজন আছে, তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব কারণে আমার বাদী পক্ষ ও বিশেষ করে আমার বাদী ও তার আত্মীয়স্বজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং তারা শঙ্কিত হয়ে পরছেন।
তিনি আরও জানান, আদালতের ভেতর ঘাতকদের আইনজীবীরা হট্টগোল করেন। ধারণা করছি এই মামলার বিচার যাতে সঠিকভাবে হতে না পারে সেজন্য সাক্ষীদেরও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এই মামলার সব সাক্ষীকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে সরকারের কাছে আবেদনও জানান তিনি।
সাত খুনের ঘটনায় নিহত মনিরুজ্জামান স্বপন ছিলেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের বন্ধু। স্বপন আদমজী ইপিজেডে ঠিকাদারি ব্যবসা করতেন। তার ভাই মিজানুর রহমান রিপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তারপরও আমরা সাত খুনের সুষ্ঠু বিচার চাই।
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে ৫ খুনের মামলা ডিবিতে
নিহত নজরুল ইসলামের ভাই আবদুস সালাম রিপন জানান, দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল পরিবারের পক্ষ থেকে কাঙালিভোজের আয়োজন করা হবে। আমরা সাত খুনের বিচার চাই, তবে মামলা যেভাবে চলছে তাতে আমরা সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কিত।
মামলার আরেক বাদী নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার পাল বলেন, মামলার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। বিচার শেষে দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রত্যাশা করছি।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমানী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহৃত হন। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় দুটি মামলা হয়। একটি মামলার বাদী হলেন নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। অপর মামলার বাদী নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। বিজয় পাল অজ্ঞাত ও সেলিনা ইসলাম বিউটি তার মামলায় নূর হোসেনসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাব-১১ এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের পরিবারের সদস্যরা। প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুর অভিযোগ করেন, ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন। এ অভিযোগের পর র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, সাবেক অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে চাকরিচ্যুত করার পর ১৭ মে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকার সেনানিবাস এলাকা থেকে মিলিটারি পুলিশ ও ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ এবং নৌবাহিনীর গোয়েন্দারা এমএম রানাকে আটক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কাছে তুলে দেয়। পরে এ তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়।
সাত খুনের মামলায় ৩৫ আসামির মধ্যে ১২ জন পলাতক। তাদের মধ্যে মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের চার সহযোগী রয়েছেন। বাকিরা র্যাব-১১ এর সাবেক সদস্য। নূর হোসেনের পলাতক সহযোগীরা হলেন- সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান এবং জামাল উদ্দিন। পলাতক র্যাব সদস্যরা হলেন- করপোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলীম, মহিউদ্দিন মুন্সী, আল আমীন শরীফ, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, এএসআই কামাল হোসেন এবং কনস্টেবল হাবিবুর রহমান।
দুটি মামলার তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বিউটির মামলায় অভিযুক্ত ৫ জনকে। মামলাটির এখন বিচার কাজ চলছে। এতে দুটি মামলাতে সাক্ষী করা হয়েছে ১২৭ জনকে। মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন ২৩ জন।
/এমও/এএইচ/আপ-এনএস/








