যশোরে বিতর্কিত দুই পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তের মুখে পড়েছেন। এরা হলেন উপশহর ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই বিপ্লব হোসেন এবং বাঘারপাড়ার খাজুরা ক্যাম্পের ইনচার্জ এএসআই মাসুদ।
এসআই বিপ্লবের বিরুদ্ধে টাকার দাবিতে এক স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে, এএসআই মাসুদের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়া, আসামি ও চোরাচালানের পণ্য বেচাকেনার অভিযোগ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে (স্মারক নম্বর-১৬/২০.০৭.১৬) খুলনায় কর্মরত সিকিউরিটি সেলের পরিদর্শক শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি তদন্ত টিম মঙ্গলবার সকালে যশোর আসেন। আগেই কোতোয়ালি থানায় ডেকে পাঠানো হয় অভিযুক্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তা, নির্যাতনের শিকার, কথিত অভিযোগকারী এবং সাক্ষীদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্ত টিমের প্রধান উপশহর ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই বিপ্লব, নির্যাতিত স্কুলছাত্র রোহিত, তার বাবা দোকান কর্মচারী সেন্টু, মা জুলি বেগম, ফুফু মাজেদা বেগম ও মামি রোকসানাকে পৃথক পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রত্যেকের জবানবন্দি আলাদা আলাদা কাগজে লিখে সংশ্লিষ্টদের স্বাক্ষর নেন।
তদন্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম নির্যাতিত পরিবারের সদস্যদের অভয় দিয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট দফতরে তথ্য-প্রমাণসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে বিচার পাওয়া যায়।’
গত ৮ জুন উপশহর ক্যাম্পের এসআই বিপ্লব উপশহর তিন নম্বর সেক্টরের এক নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কাপড়ের দোকানের কর্মচারী কামাল হোসেন সেন্টুর ছেলে আইনুল হক রোহিতকে মোটরসাইকেল চুরির মিথ্যা অভিযোগে বাড়ি থেকে দুই দফা ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ। এরপর ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে রোহিতকে ছেড়ে দেন এসআই বিপ্লব। অথচ মোটরসাইকেলের মালিক ইসলামী ব্যাংক ঝিকরগাছা শাখার কর্মকর্তা নাজিম থানায় মামলাও করেননি। শুধু একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। পুলিশি নির্যাতনে রোহিত শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে তার পরিবারের দাবি। ঘুষের ৫০ হাজার টাকা লেনদেন সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছায়।
এদিকে, বাঘারপাড়ার খাজুরা ক্যাম্পের এসআই মাসুদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে শরিফুল নামে এক ব্যক্তি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেন বলে বলা হয়। অভিযোগে এসআই মাসুদের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারি, মাদক বেচাকেনা, টাকার বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
খুলনা থেকে আসা তদন্ত টিম মঙ্গলবার অভিযুক্ত এসআই মাসুদ এবং কথিত অভিযোগকারী শরিফুলকে কোতোয়ালি থানায় ডেকে পাঠায়। সেখানে শরিফুল নামে ওই ব্যক্তি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘জহুরপুর ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দেলু ও বন্দবিলার সাইফুজ্জামান ভোলা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমার নাম ব্যবহার করে এই ঘটনা ঘটাতে পারে।’
এদিকে, উপশহর ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই বিপ্লবের বিরুদ্ধে নিরীহ স্কুলছাত্র রোহিতকে নির্যাতনের অভিযোগ এর আগেও পুলিশ সদর দফতরের একটি টিম যশোরে এসে তদন্ত করে যায়। গত ১১ জুলাই আসা ওই টিমের সদস্যরা রোহিতের বাড়ি গিয়ে পরিবার-সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। ওই টিম নির্যাতিত রোহিতের ছবি, ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এবং ডাক্তারের চিকিৎসাপত্র নিয়ে যায়।
অপকর্মে অভিযুক্ত এসআই বিপ্লবের শাস্তি চেয়ে যশোরভিত্তিক কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা স্থানীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে। এছাড়া ঢাকাভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থার একটি দল যশোর এসে ঘটনাটি তদন্ত করে যায়। ওই টিমের প্রশ্নের জবাবে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেছিলেন, ‘টাকা লেনদেনের বিষয়টি আমিও শুনেছি। তবে এই লেনদেন হয় চুরি যাওয়া মোটরসাইকেল মালিকের সঙ্গে চোর হিসেবে অভিযুক্ত রোহিতের পরিবার-সদস্যদের। এসআই বিপ্লব ঘুষ নেননি।’
এতো ঘটনার পরও জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আস্কারা পেয়ে এসআই বিপ্লব তার অবৈধ কর্মকা- বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উপশহর পুলিশ ক্যাম্পের নীচতলায় অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেলে এসআই বিপ্লবের তত্ত্বাবধানে দেহ ব্যবসা পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কোতোয়ালি থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে হোটেলটি থেকে খরিদ্দারসহ এক যৌনকর্মীকে আটক করে। একই ভবনের নীচতলায় দীর্ঘদিন ধরে এই অনৈতিক কারবার চললেও উপশহর ক্যাম্প ইনচার্জ কোনো ব্যবস্থা নেননি।
প্রসঙ্গত, ঘুষ লেনদেনের যে অডিও রেকর্ডটি ফাঁস হয়, তাতে এসআই বিপ্লবকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি সন্ধ্যার পর থানায় আসেন। ওসি স্যার যেভাবে বলেছেন, সেভাবে করেন।’
/এইচকে/








