খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে বকেয়া ৪৭ কোটি টাকা, ২০০ কোটি টাকার পণ্য গুদামে

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
০৭ জুন ২০১৭, ১৫:৪০আপডেট : ০৭ জুন ২০১৭, ১৫:৪৪

পাটকল খুলনা অঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর শ্রমিকরা বকেয়া মজুরি ও বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ৪০ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। তবে জানা গেছে, এই পাটকলগুলোয় ২১ হাজার ৫২৬ মেট্রিক টন উৎপাদিত পাটপণ্য মজুদ রয়েছে। এর মূল্য প্রায় ২১৪ কোটি টাকা। বাজারজাত না হওয়ায় এগুলো মিলের গুদামে পড়ে আছে।  এই পণ্য বিক্রি করে বকেয়া পরিশোধসহ মিলের অন্যান্য কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক কামাল হোসেন বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্য আট জন। এখন পর্যন্ত আমার আট সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। প্রতি সপ্তাহের মজুরিতে সংসার চালাতে হয়। কিন্তু আট সপ্তাহ মজুরি না পেলে সংসারের লোকগুলোকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। দোকানদাররা আর বাকি দিতে চাচ্ছে না। ফলে এখন আর দিন চলছে না। আর্থিক সঙ্কট এখন চরমে।’

স্টার জুট মিলের শ্রমিক আ. ছালাম বলেন, ‘পারিশ্রমিক না পেয়েও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। কিন্তু আমার পরিবারের গতি স্বাভাবিক নাই। বকেয়া পরিশোধে চলছে টালবাহানা। এখন পরিবারের সদস্যদের অনাহারে থাকতে হচ্ছে। রমজানে সেহরি ও ইফতারে খাদ্য সঙ্কট চরমে থাকে।’

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনা জোনের সমন্বয়কারী গাজী শাহাদত হোসেন বলেন, ‘শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বকেয়া পরিশোধের বিষয় বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। গত ৬ জুন বকেয়ার অর্ধেকটা পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু অর্থ ছাড় না হওয়ার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে ১৫০ কোটি টাকা ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ টাকা ছাড় হলে বকেয়া পরিশোধ করা সহজ হবে।’ পাটকল ১

তিনি আরও বলেন, ‘মিলগুলোর গুদামে মজুদ থাকা পাটপণ্য বিক্রির জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিজেএমসির পাশাপাশি প্রতিটি মিলকে স্থানীয়ভাবে বাজার সৃষ্টির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। খুলনা ও যশোরের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পাটকল প্রকল্প প্রধান ও বিক্রয় বিভাগীয় প্রধানদের নিয়ে গত ৪ জুন একটি বৈঠক হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মজুদ পাটপণ্য বিক্রি শুরু হবে বলে আশা করছি।’

ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ’র সভাপতি মো. মুরাদ হোসেন জানান, ‘১০ রমজানের (৬ জুন) মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়ার অর্ধেক পরিশোধ করার ব্যাপারে বিজেএমসির প্রতিশ্রুতি ছিল। সে সময় পার হয়ে গেছে। শ্রমিকরা ধৈর্য্য সহকারে ওই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। এখন আর নিরব অপেক্ষা নয়। রমজানে শ্রমিক পরিবারগুলোতে চরম আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বকেয়ার দাবিতে এখন আন্দোলনের বিকল্প নেই।’

বিজেএমসি খুলনা জোন অফিসের তথ্যানুসারে প্লাটিনাম জুট মিলে ৯ সপ্তাহের মজুরির ১১ কোটি ৫২ লাখ টাকা ও দুই মাসের বেতনের ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ৪৬৪১ মেট্রিক টন পণ্য মূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। ক্রিসেন্ট জুট মিলে ৮ সপ্তাহের মজুরির ১২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও দুই মাসের বেতনের ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ৪৫৭১ মেট্রিক টন পণ্য মূল্য ৪৩ কোটি  ৫০ লাখ টাকা।

খালিশপুর জুট মিলে ১ সপ্তাহের মজুরির ৬৫ লাখ টাকা ও ১ মাসের বেতনের ৫২ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ৩০৩৫ মেট্রিক টন পণ্যের মূল্য ৩২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। দৌলতপুর  জুট মিলে ১ সপ্তাহের মজুরির ১২ লাখ টাকা ও ১ মাসের বেতনের ২১ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ৭২৩ মেট্রিক টন পণ্যের মূল্য ৭ কোটি টাকা। খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে বকেয়া ৪৭ কোটি টাকা, ২০০ কোটি টাকার পণ্য গুদামে

স্টার জুট মিলে ৭ সপ্তাহের মজুরির ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা ও দুই মাসের বেতনের ১ কোটি  ৪ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ৩০০৬ মেট্রিক টন পণ্যের মূল্য ৩২ কোটি টাকা। ইস্টার্ন জুট মিলে ৬ সপ্তাহের মজুরির ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও দুই মাসের বেতনের ৭৮ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ১৬০০ মেট্রিক টন পণ্যের মূল্য ১৫ কোটি টাকা। আলীম জুট মিলে ৮ সপ্তাহের মজুরির ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ও ২ মাসের বেতনের ৪০ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ৯০০ মেট্রিক টন পণ্যের মূল্য ৮ কোটি টাকা। কার্পেটিং জুট মিলে ৬ সপ্তাহের মজুরির ৯০ লাখ টাকা ও দুই মাসের বেতনের ৪৬ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ১১৫০ মেট্রিক টন পণ্যের মূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা। যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিতে (জেজেআই) ৮ সপ্তাহের মজুরি ৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ও ১ মাসের বেতনের ৪৪ লাখ টাকা বকেয়া। মজুদ ১৯০০ মেট্রিক টন পণ্যের মূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

ক্রিসেন্ট জুট মিলের প্রকল্প প্রধান এ কে হাজারী বলেন, ‘মিলে প্রায় ৪৩ কোটি টাকার উৎপাদিত পণ্য মজুদ রয়েছে। এগুলো বিক্রি করতে পারলে বকেয়া পরিশোধ করাসহ অন্যান্য কার্যক্রমও সম্পন্ন করা সহজ হবে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় মিলে আর্থিক সংকট রয়েছে। সরকার পাটপণ্য ব্যবহার বাধ্যতামূলক করছে। পাটপণ্য রফতানিরও চেষ্টা চলছে।’

ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘উৎপাদিত পণ্য রফতানি করার ক্ষেত্রে বিজেএমসি অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ বিদেশের মার্কেট ধরে রাখতে পারছে না। এ জন্য প্রতিটি মিলে উৎপাদিত পণ্য গুদামে পড়ে আছে। আর এর খেসারত হিসেবে শ্রমিক-কর্মচারীদের অনাহারে ভুগতে হচ্ছে।’

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব লোকমান হাকিম বলেন, ‘দেশীয় বাজারে পাটপণ্যে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে তা সফল হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ফ্লাওয়ার মিলের মালিকরা মামলা করে পাটপণ্যের বাধ্যতামূলক ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি ও এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানকে ৬ মাসের জন্য স্থবির করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব মিলগুলোর ওপর পড়ছে। বিদেশেও পাটপণ্যর বাজার সৃষ্টিতে ব্যর্থতা পরিষ্কার। এখন এই ব্যর্থদের শণাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’

/এফএস/ 

আরও পড়ুন- 
পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে ২২০০ টাকা!

ঘূর্ণিঝড় মোরা: মহেশখালীর জেলে পল্লীতে স্বজনহারাদের আর্তনাদ

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম