নড়াইল জেলার লোহাগড়া ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামটি জেলার মানচিত্রে থাকলেও এখন আর দৃশ্যমান নেই। মধুমতি নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকায় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এই গ্রামটি। এছাড়া অব্যাহত ভাঙনে তেতুলিয়া গ্রামসহ আশপাশের গ্রাম, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং অসংখ্য স্থাপনাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অব্যাহত ভাঙনের কবলে ১০ বছরে গৃহহারা হয়েছে প্রায় ৯০০ পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকরী কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
তেতুলিয়া গ্রামের মগরেব মোল্যা বলেন, ‘আমার বাড়ি সাতবার ভেঙে গেছে। আমাদের ঈদগাহও ভেঙে গেছে। এবার কোথায় ঈদের নামাজ পড়বো, জানি না। এলাকাবাসীর মনে ঈদের আনন্দ নেই।’
ওই গ্রামের মমরেজ মোল্যা বলেন, ‘নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি, জমিজমা সব হারিয়ে তেতুলিয়া ও কামঠানা গ্রামের শত শত মানুষ এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। বেশিরভাগ এখন কৃষাণ বিক্রি (শ্রম বিক্রি) করে খায়। ২০ বছর ধরে নদী ভাঙলেও কেউ ইট রক্ষায় কোনও কাজ করেনি।’
একই এলাকার তোরাপ মোল্যা বলেন, পাঁচবার বাড়িঘর সরানো হয়েছে। খুব অসহায় অবস্থায় আছি। এছাড়া আমাদের মসজিদ ও কবরস্থান নদীগর্ভে চলে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, পাথর দিয়ে নদীটা যেন বেঁধে দেয়।
মধুমতি নদী ভাঙনে নিঃস্ব নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চরবকজুড়ি গ্রামের মনি মোল্যার স্ত্রী গোলজান বেগম (৫৪)। গোলজানদের বাড়ি আগে ছিল তেতুলিয়ায়। গ্রামটি নদীতে বিলীন হওয়ার পর চরবকজুড়িতে এসে বাড়ি করেন তিনি। সেখানেও ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন তারা।
গোলজান বলেন, ‘সকালে যেহানে রান্না করে খালাম (খেলাম), দুপুরে গেল নদীর প্যাটে। অবস্থা বেগতিক দেহে (দেখে) রাত ১২টার দিকে নিজেরাই ঘর ভাঙা শুরু করলাম। এই ভাঙনে ছয়টি নারকেল গাছ, ২০টি আম, ৩০টি কাঁঠাল, ১৫০টি সুপারি ও ৩০০ মেহগনি গাছসহ সবকিছু নদীর মধ্যে চলে গেছে। আর বসতভিটার ৪৫ শতক জমিও এহন (এখন) নদীর প্যাটে।’
তেতুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত হোসেন বলেন, ‘২০১৫ সালের আগস্টে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে যায়। এরপর কামঠানা এলাকায় টিনের ছোট একটি ঘরে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে জোয়ারের সময় শ্রেণিকক্ষে পানি উঠছে। ভাঙন প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বর্তমানে যেখানে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে, সেটিও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ জন। অথচ দুই বছর আগেও এ স্কুলে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল।
লোহাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৬নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত তেতুলিয়া গ্রামের ইউপি সদস্য (মেম্বার) চাঁন মিয়া মোল্যা জানান, নবম সংসদ নির্বাচনের সময় তেতুলিয়া গ্রামে ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০০ জন। ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে এ গ্রামের ভোটার সংখ্যা ছিল ৪৫০ জন। সর্বশেষ তেতুলিয়া গ্রামে নান্নু মোল্যাদের বাড়িতে তিনটি পরিবারে ভোটার সংখ্যা ছিল ১৯ জন। দু’সপ্তাহ আগে মধুমতি নদীর ভাঙনে নান্নুদের বাড়িটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
লোহাগড়া ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে তেতুলিয়া গ্রামের ৪০০ পরিবার নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে। এছাড়া কামঠানা, চরবকজুড়ি ও ছাগলছিড়া গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবার মধুমতি নদী ভাঙনের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
৫নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য নারায়ন বিশ্বাস বলেন, ‘এ এলাকায় বন্যা নেই। তবে নদী ভাঙনের কারণে শত শত মানুষকে যেখানে-সেখানে থাকতে হচ্ছে। তেতুলিয়া বিলীন হওয়ার পর এখন চরবকজুড়ি ও কামঠানা গ্রাম ভাঙছে।’
লোহাগড়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মান্টু সিকদার জানান, ছাগলছিঁড়া-আমডাঙ্গা-চরবকজুড়ি থেকে লোহাগড়া উপজেলা সদরে যাতায়াতের কাঁচা রাস্তার প্রায় এক কিলোমিটার অংশ মধুমতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া ভাঙনের তীব্রতায় এ এলাকার বিদ্যুৎ লাইনও খুলে ফেলেছেন ভুক্তভোগীরা। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন সবাই।
লোহাগড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম শিকদার জানান, গত ১০ বছরে তেতুলিয়া গ্রামের ৪০০ পরিবার নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে। এছাড়া কামঠানা, চরবকজুড়ি ও ছাগলছিড়া গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবার মধুমতি নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। নদী ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, ‘তেতুলিয়ার নদী ভাঙন কবলিত এলাকা ইতোমধ্যে পরিদর্শন করেছি। ওই এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বাজেট পেলে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








