ইমাম সাহেব ‘জঙ্গি’ জেনে বিস্মিত মাঠপাড়ার বাসিন্দারা

তৌহিদ জামান, যশোর
২৫ অক্টোবর ২০১৭, ১৮:৫৬আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৭, ২০:০৪





মোজাফফর হোসেন (ছবি: যশোর প্রতিনিধি) যশোর সদরের পাগলাদহ মাঠপাড়া এলাকায়  ‘নব্য জেএমবির সংগঠক’ হিসেবে স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফর হোসেনকে ধরে নিয়ে গেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তার জঙ্গি সম্পৃক্ততায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। ইমাম হিসেবে মোজাফফর হোসেনকে সাদামাটা মানুষ হিসেবেই চিনতেন বলে দাবি করেছেন তারা। মোজাফফরের বাড়িতে যে বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম, অ্যাসিড,  অস্ত্র-গুলি থাকতে পারে―এটি অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় লোকজন।

মঙ্গলবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদক সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন।  যশোর সরকারি এমএম কলেজের পুরাতন হোস্টেল জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর যশোর সদরের নওয়াপাড়া ইউনিয়নের পাগলাদহ গ্রামের মাঠপাড়া এলাকায় জমি কিনে প্রায় ১৪-১৫ বছর ধরে বসবাস করছেন। স্ত্রী ও তিন কন্যা সন্তান রয়েছে তার পরিবারে। এরমধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।



মোজাফফরের বাড়ি লাগোয়া প্রতিবেশী বাবুল শেখ বলেন, ‘উনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন।  তার পরিবারের সদস্যরা খুবই পর্দানশীল। পাশাপাশি থাকা হলেও তার সঙ্গে (মোজাফফর) বেশি একটা কথা হতো না। রাস্তায় দেখা হলে সালাম বিনিময় পর্যন্ত। তবে তাদের বাড়িতে বোরকা পরিহিত মহিলারা আসতেন। শুনেছি সেখানে ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করা হতো।’ ইমাম সাহেব ‘জঙ্গি’ জেনে বিস্মিত মাঠপাড়ার বাসিন্দারা (ছবি: যশোর প্রতিনিধি)
তাদের অপর প্রতিবেশী দুই সন্তানের মা লিজা খাতুন ও তার শাশুড়ি সুফিয়া বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, মোজাফফর হোসেন খুব নামাজি মানুষ। সবাইকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের দাওয়াত দিতেন।  তার স্ত্রী ও মেয়েরা খুবই পর্দানশীল। যারা নামাজ আদায় করেন না,  তাদের সঙ্গে তারা বেশি একটা কথা বলতেন না।  মেয়েরা মাঝেমধ্যে বিকালের দিকে নদীর ধারে অল্প সময়ের জন্যে বেড়াতে আসতো। ‘ওই বাড়িতে এমন অস্ত্র-গুলি মজুদ ছিল এটা আমরা ভাবতেই পারছি না’ বলেন দুই নারী। তারা আরও বলেন, ‘মোজাফফর সাহেব গরু পুষতেন। এই গরুর পেছনেই বেশি সময় ব্যয় করতেন। আর গরুর দুধ শহরে বিক্রি করতেন।’
অপর প্রতিবেশী শওকত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি তিন বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। উনার সঙ্গে খুব অল্প সময়ই দেখা-সাক্ষাৎ হতো। তবে দেখা হলে নামাজ পড়ার কথা খুব বলতেন। ২৩ অক্টোবর রাতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আমাদের এখানে অভিযান চালানোর সময় জানতে পারি, উনি জঙ্গি কোনও সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিষয়টি নিয়ে আমরাও সংশয়ের মধ্যে রয়েছি। তার ঘর থেকে কিভাবে এতো অস্ত্র, গোলা-বারুদ উদ্ধার হলো, তা ভাবতেই পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মোজাফফর সাহেব প্রচুর পরিশ্রম করতেন। বাইরে থেকে ঘাস কেটে এনে গরুকে খাওয়াতেন। একটা মোটরসাইকেল ছিল। সেটাতেই তিনি চড়তেন।’
একই পাড়ার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব আবুল হোসেন বলেন, ‘১৯৭৬ সাল থেকে এই গ্রামে বসবাস করছি। ইমাম সাহেবের সঙ্গে রাস্তায় মাঝেমধ্যে দেখা হতো। কুশল বিনিময় ছাড়া তেমন কোনও আলাপ হয়নি। তিনি যে কোনও জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত বা তার বাড়িতে এত অস্ত্র, গোলা-বারুদ মজুদ আছে সে খবরটি সেদিন রাতে টেলিভিশনের মাধ্যমে জানতে পারি।’

একই কথা জানান মাঠপাড়ায় চা দোকানি তোফাজ্জেল হোসেন। তিনি বলেন,  ‘ইমাম সাহেব কখনোই চা খেতে আসেননি এই দোকানে। তবে দোকানে থাকা লোকজনকে মাঝেমধ্যে নামাজের দাওয়াত দিতেন। আমরা ভাবতেই পারি না লোকটি একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।’

মোজাফফর হোসেনের বিষয়ে কথা হয় নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর মুক্তা ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ভোটের সময় কয়েকদফা গিয়েছি তাদের বাড়িতে। লোকটাকে খুব সৎ মনে হয়েছে আমার। কিন্তু তার ভেতরে যে এমন কিছু (জঙ্গিবাদ) লুকিয়ে রয়েছে- তা আমার জানা ছিল না।’ ইমাম সাহেব ‘জঙ্গি’ জেনে বিস্মিত মাঠপাড়ার বাসিন্দারা (ছবি: যশোর প্রতিনিধি)

বুধবার (২৫ অক্টোবর) সকালে কথা হয় পুরাতন ছাত্রাবাস জামে মসজিদে নামাজ আদায় করা মুসল্লি ও ছাত্রদের সঙ্গে। তারাও মোজাফফর হোসেনের জঙ্গি সম্পৃক্ততার খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। পুরাতন ছাত্রাবাসের বাসিন্দা বাংলা (অনার্স) প্রথম বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম আকরাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইমাম সাহেব নামাজের দু’এক মিনিট আগে আসতেন। নামাজ শেষ হলেই চলে যেতেন। তিনি বাইরের কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলতেন না। তিনি গরু পোষা এবং দুধ বিক্রিতেই বেশি সময় ব্যয় করতেন বলে জানি।’

মসজিদের বিপরীত দিকের একটি বাড়ির বাসিন্দা পলাশ জানান, ‘মোজাফফর হোসেনকে কোরান-হাদিস বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করা হলে তার স্পষ্ট জবাব দিতেন। তবে, বাড়ি দূরে হওয়ায় তিনি ফজরের নামাজে ইমামতি করতেন না। এছাড়া মোনাজাতের বিষয়েও তার সঙ্গে আমাদের কথা কাটাকাটি হয়েছে। কিন্তু তিনি যে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এ বিষয়টি আমরা বুঝতে পারিনি।’

পুরাতন ছাত্রাবাসের পাহারাদার মো. সোবহান বলেন, ‘বহু বছর ধরে ইমাম সাহেবকে চিনি। তিনি কখনও তিন-চারজন লোকের সঙ্গে মসজিদের ভেতরে বা বাইরে আলাদাভাবে কথা বলেছেন- এমন কোনও দৃশ্য আমার চোখে পড়েনি। খুব পরিশ্রমী মানুষ তিনি। এখান থেকে ঘাস কেটে মোটরসাইকেলে নিয়ে যেতেন। আবার বাড়ি থেকে দুধ দুইয়ে এনে এ অঞ্চলের কয়েকটি বাড়িতে তা বিক্রি করতেন।’

মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. বেলাল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হুজুর বেশ জ্ঞানী মানুষ। তার বক্তব্য ছিল, সবসময় মোনাজাত করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। মাঝেমধ্যে মোনাজাত করা যেতে পারে। এই মোনাজাতের বিষয় নিয়েই মুসল্লিদের সঙ্গে তার বাহাস হতো।’এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তার বাড়ি মসজিদ থেকে অনেক দূরে হওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে তিনি ফজরের নামাজ পড়াতে আসতেন না।  সেসময়ে আমি নামাজে ইমামতি করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তার জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন বিষয় জানা থাকলে অবশ্যই কলেজ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতাম।’

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাউদ্দিন শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'মোজাফফরকে রিমান্ডে আনা হলে জানতে পারবো সে কিভাবে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত হলো, কারা কারা তার সঙ্গে কাজ করে, কিভাবে তারা কাজ করে এসব বিষয়সহ অন্যান্য তথ্য। আর এলাকার লোকজন যে তাকে ভালো বলেছে, এটা হতে পারে। অনেক জায়গায় জঙ্গিদের বাবা-মাও জানতো না যে তাদের সন্তান জঙ্গি। এলাকাবাসীর কাছে বিষয়টি অজানা থাকতেই পারে।' 
প্রসঙ্গত, গত ২৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দফতর ও বিশেষ শাখার তথ্য অনুযায়ী যশোরের পুলিশ শহর থেকে মোজাফফর হোসেনকে আটক করে। এরপর তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ তার বাড়ি থেকে ৫০টির বেশি গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম, একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি, পাঁচ লিটার অ্যাসিড, ও তিনটি চাকু উদ্ধার করে। সে রাতেই সন্ত্রাস দমন আইনে মোজাফফর হোসেন ও অজ্ঞাত ৩/৪জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। এরপর ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় মোজাফফর হোসেনকে সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। ২৬ অক্টোবর আদালতে তার রিমান্ড শুনানি হবে। 

আরও পড়ুন- 

যশোরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নব্য জেএমবির আঞ্চলিক সংগঠক আটক

যশোরে আটক জঙ্গি মোজাফফর কারাগারে




/এফএস/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক