চাকরির নামে ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়াসহ প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (গাজীপুর) তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে খুলনায় মামলা হয়েছে। খুলনার বিএল কলেজের ছাত্র মো. ওহিদুল ইসলাম রবিবার (৪ মার্চ) খুলনার নালিশী মামলার আমলী আদালত ‘গ’ অঞ্চলে মামলাটি দায়ের করেন। আদালতের বিচারক মহানগর হাকিম মো. শাহীদুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলায় অভিযুক্তরা হলো ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৌলী সম্পদ ও বীজ বিভাগের ফিল্ড ম্যানেজার মো. ফারুক হোসেন, একই বিভাগের ম্যানেজার মো. আক্কাছ সরদার, কর্মকর্তা মো. এনামুল হক এবং ফারুক হোসেনের স্ত্রী রুমা বেগম ও বাবা মো. হারুন-অর-রশীদ।
বাদী পক্ষের আইনজীবী বিধান ঘোষ বলেন, ‘আদালত বাদীর অভিযোগ আমলে নিয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী ১ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।’
মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ওহিদুল ইসলাম বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার গাওলা গ্রামের নূর আলীর ছেলে। তার সঙ্গে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফিল্ড ম্যানেজার ফারুক হোসেনের বাবা মো. হারুন-অর-রশীদ পূর্ব পরিচিত। সেই সুবাদে হারুন-অর-রশীদ তাকে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে অফিস সহকারী পদে চাকরি দিতে পারবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি তার ছেলের সঙ্গে তাকে মোবাইলে কথা বলিয়ে দেন। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক টাকা সংগ্রহ করে খবর দিয়ে গত বছরের ১২ মে হারুন তার ছেলে ফারুক ও ছেলের স্ত্রী রুমা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে বিএল কলেজের মহসিন হলের ১০৬ নম্বর কক্ষে আসেন। কথা-বার্তার এক পর্যায়ে বাদী ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দিতে চাইলে তারা রাজি হননি। যে কারণে সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের সামনে তাদের হাতে নগদ ৯ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়। এ সময় তারা ওহিদুলের কাছ থেকে অফিস সহকারী পদে নিয়োগের একটি আবেদনপত্রেও স্বাক্ষর করিয়ে নেন এবং অন্যান্য কাগজপত্রও নিয়ে যান। ২১ মে চাকরির ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য গাজীপুরের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে যেতে বলা হয়। সে মোতাবেক ওহিদুল উপস্থিত হলে ফারুক হোসেন তাকে ইনস্টিটিউটের ম্যানেজার মো. আক্কাছ সরদার ও কর্মকর্তা মো. এনামুল হকের কাছে নিয়ে যায়। তারাই তার ইন্টারভিউ নেয়। ওই দিনই তাকে উত্তীর্ণ দেখিয়ে একটি ভুয়া নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়। যাতে ওই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) জাহিদুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে। একই সঙ্গে ওই নিয়োগপত্র দেখিয়ে তাকে বাগেরহাট সিভিল সার্জনের দফতর থেকে মেডিক্যাল সনদ নিয়ে ১ জুন চাকরিতে যোগ দিতে বলা হয়। ওহিদুল তাদের কথামতো মেডিক্যাল সনদ নিয়ে গেলে তাকে কথিত চাকরিতে যোগদান করানো হয়। যোগদানের পর অভিযুক্তরা তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে অফিসের পাশের একটি ধানক্ষেতে নামিয়ে দিয়ে বলে— ধান চাষ দিয়েই তোমার ট্রেনিং শুরু হলো, তবে কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে তুমি এখানে চাকরিতে যোগদান করেছো। এতে ওহিদলের মনে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি হলেও তিনি মনোযোগ দিয়ে ধান চাষের কথিত ট্রেনিং চালিয়ে যেতে থাকেন। এভাবে এক মাস পার হলে বেতন বাবদ তাকে চায়ের দোকানে ডেকে একটি হাজিরা রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর নিয়ে ১১ হাজার ৩শ’ টাকা দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগে আরও উল্লেখ রয়েছে, এভাবে সেখানে তার মতো এনামুল হক ও আক্কাস সরদার নামে আরও দুই জনকেও কথিত বেতন দেওয়া হয়। কিন্তু দ্বিতীয় মাসে তারা কোনও বেতন না দেওয়ায় সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। তারা জানায়, চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য সময় লাগবে। ৪/৫ মাস কোনও বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। এ সময় ওহিদুল প্রতিবাদ করলে জীবননাশের হুমকি দিয়ে তাকে বের করে দেয়।’ এভাবে তারা বেকার তরুণদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
ওহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি চাকরির জন্য বাড়ির জমিসহ অন্যান্য মালামাল বিক্রি এবং ধার করে টাকা জোগাড় করেন। এখন প্রতারণার শিকার হয়ে তার লেখাপড়া এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’তিনি প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, এর আগেও ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে একাধিক বেকার তরুণের কাছ থেকে ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট র্যাব-১ এর সদস্যরা ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফিল্ড ম্যানেজার মো. ফারুক হোসেনসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। ওই ঘটনায় প্রতারণার শিকার খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার লাইন বিল পাবলা গ্রামের রাজেন্দ্রনাথ পাত্রের ছেলে উজ্জল কুমার পাত্র গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন।







