শিশু কন্যার যৌন নির্যাতনের ঘটনায় বিচার না পেয়ে দু’সন্তানকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যার অভিযোগের পর মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার (২ এপ্রিল) বিকাল ৫টায় সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ তিনটি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার লাঙ্গলঝাড়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে দুই শিশুর মা মাহফুজা খাতুনের ভাই যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নের বসতপুর গ্রামের হযরত আলীর ছেলে মশিয়ার রহমান বাদী হয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় হৃদয় গাজী, তার বাবা লাল্টু গাজী ও মাহফুজার চাচা শ্বশুর ইয়াকুব আলীর নাম উল্লেখ করে থানায় এজাহার দায়ের করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, শিশুর কন্যার ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনার বিচার পেতে স্থানীয় ইউপি সদস্য, মহিলা সদস্য ও লাঙ্গলঝাড়া চেয়ারম্যানের কাছে যেয়েও হতাশ হয়েছেন মাহফুজা। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোটের হিসাব নিকাশ করতে দায় এড়িয়ে সময় পার করেছেন সবাই। বিচার না পেয়ে দু’সন্তানকে হত্যঅ করে নিজে আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছিলেন মাহফুজা। এ অবস্থায় মাহফুজা দু’সন্তানকে মেরে নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়েও কথা বলেছেন স্বামীর সঙ্গে। একপর্যায়ে মারা যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে মাহফুজার হাত থেকে মোবাইলফোন ঘরের মেঝেতে পড়ে যায়।
মাহফুজার ভাই মশিয়ার রহমান বলেন, বিয়ের পর থেকে চাচা শ্বশুর ইয়াকুব আলীর বাড়িতে যাতায়াত করতো বোন মাহফুজা। দুলাভাই কাজের জন্য বেশিরভাগ সময় বাড়িতে না থাকার কারণে বোনকে কু’প্রস্তাব দেওয়ায় চাচা শ্বশুরের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দেয় মাহফুজা। একপর্যায়ে মাহফুজাকে ব্যাপক মারপিট করা হলে স্থানীয়ভাবে শালিসি বৈঠক ডেকে মিটিয়ে দেওয়া হয়। এরপরও তার বোনের ওপর ইয়াকুবের কুদৃষ্টি ছিল। দেড় বছর আগে গভীর রাতে ঘরের টালি খুলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলে বোন টর্চ মেরে চিৎকার করলে ইয়াকুব পালিয়ে যায়।
তবে ইয়াকুব আলী তার বিরুদ্ধে ওঠা সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, মাথা গরম থাকার কারণে বৌমা সব সময় তাদের সঙ্গে বিরোধ করতো।
এদিকে, শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে মাহফুজা ও তার দু’সন্তানের লাশের ময়নাতদন্ত শুরু করেন সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. অসীম সরকার ও ডা. সেলিম রেজা। সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে মৃতদেহের কোনও কোনও স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখে দায়িত্বপালনকারী চিকিৎসক ময়নাতদন্তের কাজ বন্ধ রেখে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কলারোয়া থানার উপ-পরিদর্শক আবু হানিফকে ডেকে আনেন মর্গে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন সংশোধন করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। বিকাল ৫টার দিকে পূর্ব লাঙ্গলঝাড়া গ্রামে নামাজে জানাজা শেষে লাশ তিনটি দাফন করা হয়।
ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সেলিম রেজা বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ার আগে কোনও মন্তব্য করা যাবে না।
মাহফুজার ভাই মশিয়ার রহমান জানান, তিনি মনে করেন ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনায় বিচার না পাওয়া, থানা পুলিশ করতে চাইলে ধর্ষণের চেষ্টাকারীর বাবার হুমকি ও মাহফুজার চাচা শ্বশুরের বিরোধিতার কারণে তার বোন, ভাগ্নে ও ভাগ্নিকে মরতে হয়েছে। মৃত্যুর জন্য ওই তিন জন দায়ী। তাই ওই তিন জনকে আসামি করে তিনি থানায় এজাহার দিয়েছেন।
কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর খায়রুল কবীর জানান, মশিয়ার রহমানের এজাহারটি তিনি পেয়েছেন। যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, শবে বরাতের দিন সকাল ১১টার দিকে বাড়িতে খেলা করতে এলে পূর্ব লাঙ্গলঝাড়া গ্রামের লাল্টু গাজীর ছেলে হৃদয় ঘরের পাশে ডেকে নিয়ে মাহফুজার পাঁচ বছরের মেয়ে মোহনাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। বিষয়টি জানতে পেরে স্বামী, শ্বশুর ও জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েও বিচার না পাওয়ায় ঘোষণা দিয়েই দু’সন্তানকে হত্যা করে নিজে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।









