X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

৪৫ বছর ধরে খেজুর গাছ কাটেন মোশাররফ, খাঁটি গুড়ের কেজি ৪০০ টাকা 

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:৩০

যশোর সদরের তেজরোল গ্রামের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেনের বয়স এখন প্রায় ৭০ বছর। কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও নিজের নেই কোনও ক্ষেত-খামার। পরের জমি এবং অন্যের খেজুর গাছ বর্গা নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। মোশাররফ হোসেন ৪৫ বছর ধরে খেজুর গাছ কাটেন; রস আহরণ থেকে শুরু করে গুড়-পাটালি তৈরি ও বাজারজাত করেন।
এ বছর তিনি ১৫৩টি গাছ বর্গা নিয়েছেন। গাছের মালিক পান অর্ধেক আর তিনি অর্ধেক। তার কাছে পাওয়া যায় খাঁটি গুড়।

১৮ জানুয়ারি ভোরে তার বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। এদিন তিনি ৫২টি গাছ থেকে আহরণ করেন ২৮ ভাড় রস। মালিকপক্ষকে দেওয়ার পর নিজে রাখেন ১৪ ভাড়, এক ভাড় নিজেদের খাওয়ার জন্য বাকিটুকু গুড়-পাটালি তৈরির জন্য। ১৩ ভাড় রস তাপালে (রস তৈরির পাত্র) দিয়ে স্বামী-স্ত্রী প্রায় দুই ঘণ্টা জ্বাল দেন বিশেষ চুলায়। রসের রঙ পরিবর্তন হলে অর্থাৎ, গুড় হলে সেটি আলাদা পাত্রে নিয়ে তাতে বীজ মারেন। বীজ মারার ফলে গুড় জমাট বাধতে শুরু করে, যা পরে নির্দিষ্ট আয়তনে সেই গুড় ঢেলে তৈরি করেন পাটালি। তিনি এ বছর ৪০০ টাকা দরে পাটালি বিক্রি করছেন।
 
 যশোরের যশ, খেজুরের রস

“যশোরের যশ, খেজুরের রস” প্রবচনটির সঙ্গে দেশের মানুষ বেশ আগে থেকেই পরিচিত। শীতের শুরুতে খেজুরের রস, গুড় আর পাটালির জন্য মানুষ উদগ্রীব হয়ে থাকেন।আর শহরে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সমাগম ঘটে গ্রামের বাড়িতে, স্বজনদের কাছে।শীতের পিঠা-পায়েস খাওয়াই অনেকের উদ্দেশ্য।

তবে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, গাছিদের অনাগ্রহ ও ন্যায্যমূল্যের অভাবে কিছুটা ভাটা পড়েছে এই শিল্পে। নানা সংকটের মধ্যেও যশোর অঞ্চলের খেজুরের পাটালি আর গুড়ের উৎপাদন ও বিকিকিনি চলছে।

 যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, যশোর জেলায় প্রায় ১৬ লাখ খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ গাছে রস উৎপাদন হয়। এসব খেজুর গাছ থেকে বছরে ৫ কোটি লিটারের বেশি রস উৎপাদিত হয়। এই রসে বছরে গুড় উৎপাদিত হয় প্রায় ৫২ লাখ কেজি। যার মূল্য একশ’ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে জেলার ১৩ হাজার ১৭৩ জন গাছি রয়েছেন। প্রতিকেজি খাঁটি গুড় ও পাটালি ৩৫০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়।স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব গুড়-পাটালি দেশের অন্যান্য জেলায়ও যাচ্ছে।

তবে, জেলায় আগের মতো খেজুর গাছ নেই, একই সঙ্গে গাছির সংখ্যাও কমেছে।অভিজ্ঞ গাছি ছাড়া রস সংগ্রহ করা যায় না। গাছিদের পরবর্তী প্রজন্ম খুব বেশি এই পেশায় আগ্রহী হচ্ছে না। সংকটের আরেকটি কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিশ্রম ও উৎপাদন খরচ অনুযায়ী গুড়-পাটালির ন্যায্য দাম না পাওয়া।
 
 রসের জন্য খেজুর গাছ প্রস্তুত

আশ্বিনের শেষের দিকে গাছিরা খেজুরগাছকে প্রস্তুত করতে থাকেন রস আহরণের জন্য। প্রথমে গাছের বাকল কেটে প্রস্তুত করা হয়। যেখান থেকে নেমে আসবে অমিয়ধারা-তা সাফ-সুতরো করতে থাকে গাছিরা। এক একজন সুদক্ষ গাছি কোমরে দড়ি বেঁধে ধারালো গাছিদা দিয়ে নৈপূণ্যে গাছ কাটেন। প্রস্তুতি শেষে গাছ কাটার পালা, অর্থাৎ রস তোলার পালা। গাছের উপরিভাগের নরম অংশকে কেটে গাছি সেখানে বসিয়ে দেন বাঁশের তৈরি নালা। গাছের কাটা অংশ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রস এসে নল দিয়ে ফোটায় ফোটায় জমা হয় হাড়িতে। প্রথম রস একটু নোনা। গাছি একদিন কাটার পর বিরতি দেন। কিছুদিন বিরতির পর আবার কাটেন। এবারের রস সুমিষ্ট।যার মৌ মৌ সুগন্ধ ছড়ায় চারদিকে। সুবাস আর স্বাদ নিতে ভিড় জমায় পিঁপড়া, মৌমাছি, পাখি, কাঠবিড়ালি ও বাদুড়। এই রসের নামই নলেন রস; যা গাছিদের নৈপুণ্যে তৈরি এক বিস্ময়।

তেজরোল পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ঝুঁকি নিয়ে গাছ কাটতে হয়। ভোরে গাছ থেকে রস নামানো খুব কঠিন কাজ। এরপর চুলা জ্বালিয়ে গুড়-পাটালি তৈরি করে বিক্রি করতে হয়। এতো কষ্ট করার পরও ভালো দাম পাওয়া যায় না। কষ্টের তুলনায় লাভ হয় না। এ জন্য আগের মতো যেমন গাছ নেই, তেমনি গাছিও কমেছে।

 কোদালিয়া গ্রামের জিয়াউর রহমান বলেন, পাঁচ বছর আগেও আমাদের প্রায় দেড়শটি খেজুর গাছ ছিল। কিন্তু গাছির অভাবে আমরা আর রস উৎপাদনে যেতে পারিনি। এখন কিনেই খাওয়া লাগে। গাছগুলো বিক্রি করে দিয়েছি।
 
অনলাইনে গুড়-পাটালি বিক্রি

যশোরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে গুড়-পাটালি বিক্রি করে থাকে। এতে বাজার কিছুটা সম্প্রসারণ হচ্ছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কেনারহাটের অন্যতম উদ্যোক্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর বাঘারপাড়ার ১৬০ জন গাছির সঙ্গে চুক্তি করেছি। তাদের মধ্যে ৭০-৭৫ জন আমাদের গুড়-পাটালি সরবরাহ করেছেন। ইতোমধ্যে আমরা তিন হাজার কেজির বেশি গুড়-পাটালি বিক্রি করেছি। ঢাকা ও সিলেটে ক্রেতার সংখ্যা বেশি। তা ছাড়া দেশের প্রায় সব জেলাতেই আমরা পাঠিয়েছি। আরও অর্ডার রয়েছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় বাজারের তুলনায় আমরা একটু বেশি দাম ধরেছি। কেননা নির্ভেজাল পণ্যের চাহিদা বেশি হওয়ায় দাম একটু বেশি হয়। ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। গুড়-পাটালির বাজার সম্প্রসারণ করতে পারলে গাছিরা দাম বেশি পাবে। কেনারহাট কেজিপ্রতি পাটালি ৩৬০ টাকা এবং গুড় ৩২০ টাকা, এ ছাড়া নারিকেল দেওয়া পাটালির দাম ধরা হয়েছে ৪০০ টাকা।

 তরিকুল ইসলাম বলেন, দেশের বাইরে আমরা এখনও সেভাবে পাঠাতে পারিনি। এর প্রধান কারণ আমাদের বিএসটিআইয়ের প্যারামিটার নেই। আমরা এ বছর চেষ্টা করেছিলাম। তবে, একটি কথা সত্য যে, দেশের বাজারে গুড়-পাটালির যে চাহিদা- সেটি পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হয়। সিলেটে বা ঢাকায় যে পাটালি পাঠানো হয়, আমার ধারণা সেখান থেকে লোকজন দেশের বাইরে তাদের স্বজনদের জন্য পাঠান।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের একজন ব্যবসায়ী আমাদের কাছ থেকে কয়েক টন গুড়-পাটালি নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা দিতে পারিনি।
 
গুড়-পাটালিতে চিনি

অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে যশোরের বিখ্যাত খেজুরের পাটালির সুনাম হারাতে বসেছে। শীত মৌসুমে শহরের অলি-গলি ও দোকানে যে পাটালি-গুড় পাওয়া যায়, তার বেশিরভাগই ভেজাল। কম দামের চিনি মিশিয়ে খেজুরের পাটালি বলে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়।

গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খেজুরের রস যখন জ্বালানো হয়, সেসময় আখের গুড়ের মুচি (পাটালির মতো শক্ত) ও পুরনো গুড় (উলা গুড়) সঙ্গে মিশিয়ে ঘন করা হয়। এরপর তাতে চিনি মিশিয়ে বীজ দিয়ে পাটালি তৈরি করা হয়। পাটালির ঘ্রাণ বের করতে তাতে বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করে তারা। এরপর সেই পাটালি বা গুড়কে খাঁটি বলে ক্রেতাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ৭০ টাকার কেজি দরের চিনি আর ৮০-৯০ টাকা দরের আখের গুড়ের মুচি দিয়ে তৈরি এসব পাটালি দুইশ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
কোদালিয়া এলাকার

স্থানীয় গাছি কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, একসময় আমাদের এই এলাকার গুড়-পাটালির বেশ নাম ছিল। কিন্তু ইদানিং সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছি। পাটালি-গুড়ে চিনি মেশানোর ফলে সেই স্বাদ আর নেই। এতে করে এলাকার বদনামও হচ্ছে। আসল গুড় তৈরি করে আমাদের লাভ কম হয়।
 
 কাঁচা রসে নিপাহ ভাইরাস

নিপাহ ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয় গাছিরা নিজস্ব প্রযুক্তির ব্যবস্থা নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে তারা খেজুর গাছের গাছের পাতা ও ফাতা (পাতার গোড়া থেকে বিস্কুট রঙের চওড়া কাগজের মতো) বেঁধে দেন। এতে করে বাদুড়সহ যেকোনও পাখি সেই গাছের রস পানে বাধা পায়।

গহেরপুর গ্রামের গাছি নাজিম উদ্দিন বলেন, রস খেতে বাদুড় এসে রোগ ছাড়াচ্ছে। বাড়ি খাওয়ার জন্য যে রস, তার জন্য গাছের বাগলো (পাতা) চিরে নলের পাশ থেকে ভাড়ের মুখ পর্যন্ত ঢেকে রাখি। তাতে বাদুড় শুধু নয়, কোনও পাখিও বসতে পারে না। এখন অনেকেই রস নিরাপদ রাখতে নেট ব্যবহারও করছেন।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান জাহিদ বলেন, বাংলাদেশ-ভারতে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায় মূলত বাদুড়। এই বাদুড় খেজুরের রস খায়। বাদুড়ের মুখের লালা, তার বিষ্ঠা, প্রস্রাব এমনকি যদি তার পা বা ডানাও রসের সংস্পর্শে আসে, তাতেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। তবে, রস যদি একটু জ্বালিয়ে (যে তাপমাত্রায় ভাত বা ডিম ভাজি করা হয়) পান করা যায়, তবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। অর্থাৎ, আমরা কাঁচা রস পান না করারই পরামর্শ দিয়ে থাকি।

 যশোরের সিভিল সার্জন বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, এর অ্যান্টিভাইরাল কোনও ওষুধ নেই। আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেহেতু স্পেসিফিক ওষুধ নেই, সেক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্তদের বেশির ভাগই মারা যায়। তাই সতর্কতাই বেশি জরুরি। মানুষ যেন কাঁচা রস পান না করেন সেটাই আমাদের পরামর্শ।

যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমরা ৩০ জন গাছি নিয়ে একটি গ্রুপ করেছি। ১৯ জানুয়ারি তাদের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক সভা করেছি। খেজুর গুড়ের বিশুদ্ধতার জন্য তাদের মাঝে মাস্ক, হাতের গ্লাভস, অ্যাপ্রন, টিশার্ট ইত্যাদি সরবরাহ করেছি। গুড় যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থাকে, সেলক্ষ্যে আধা কেজির ৫০০ স্বচ্ছ প্যাকেট সরবরাহ করেছি। যাতে আমাদের ট্যাগ লাগানো রয়েছে। উৎপাদকরা যদি সচেতন হন, তবে নোংরা কাগজে আর গুড়-পাটালি বাজারজাত করবেন না। এতে গুড়ের দাম প্যাকেট প্রতি ৫ টাকা বাড়লেও কোনও সমস্যা হবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার জানামতে- এখনও বিদেশে গুড়-পাটালি রফতানি শুরু হয়নি। তবে, আশা করছি- ফলমূল, সবজির মতো সুস্বাদু গুড়-পাটালিও রফতানি করা যেতে পারে। কেননা দেশের বাইরে যেসব অঞ্চলে বাঙালি রয়েছেন, তারা তো এই গুড়ের স্বাদ গ্রহণ করতে চাইবেনই। এমনিতেই হয়তো যারা আসেন- তারা সঙ্গে করে কিছু নিয়ে যান।
 

 

 

/এএম/টিটি/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
পাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
আইপিএলপাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
হাত-মুখ বেঁধে ২ বোনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ
হাত-মুখ বেঁধে ২ বোনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ
দুই বোনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: গ্রেফতার ৩
দুই বোনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: গ্রেফতার ৩
ছেলে হত্যার অভিযোগে বাবা আটক
ছেলে হত্যার অভিযোগে বাবা আটক
৪ বছরেও শেষ হয়নি সেতুর কাজ, উঠতে হয় মই দিয়ে
৪ বছরেও শেষ হয়নি সেতুর কাজ, উঠতে হয় মই দিয়ে
মাসে ৫ লাখ টাকার ডিম বিক্রি করেন মাহাবুব
মাসে ৫ লাখ টাকার ডিম বিক্রি করেন মাহাবুব