ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে সাফল্যের মুখ দেখছে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ৯৯ গ্রামের প্রায় ৬ হাজার পরিবার আত্মনির্ভরশীল হয়েছে। প্রকল্পের ৫ হাজার ৯৪০ সদস্যের প্রায় ৮ কোটি টাকার সঞ্চয় জমা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্রতাকে জয় করা গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দরিদ্র মানুষের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তিনি হচ্ছেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মানোয়ার হোসেন মোল্লা। তার সার্বিক সহযোগিতায় প্রকল্পটি সাফল্যের মুখ দেখেছে। এ প্রকল্পের কার্যক্রম সন্তোষজনক হওয়ায় কালীগঞ্জ উপজেলাকে মডেল উপজেলার ঘোষণার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ৯৯ গ্রামে প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। এর আওতায় রয়েছে প্রায় ছয় হাজার পরিবার। প্রতিটি পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তাদের নিজস্ব সঞ্চয় তহবিল রয়েছে ৩ কোটি টাকা। সঞ্চয়ের বিপরীতে বোনাস রয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর সঞ্চয়ের বিপরীতে সরকার প্রদত্ত উৎসাহ বোনাস ও আবর্তক তহবিল আছে আরও ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে সঞ্চয় জমা হয়েছে ৮ কোটি টাকা। এই তহবিলের কোনও অর্থই সরকার কখনও ফেরত নেবে না।
বেজপাড়া গ্রামের ইউনুচ আলী জানান, এ প্রকল্পের আওতায় তিনি অনেকটা স্বাবলম্বী হয়েছেন। প্রকল্প অফিস থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ঋণ নিয়ে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতর পালন করেছেন। পরে তা বিক্রি করে লাভের টাকা রেখে ঋণও পরিশোধ করে দিয়েছেন। তার আগে মাত্র ১০ শতক জমি ছিল। একটি বাড়ি করতে তিনি ৩ শতাংশ জমিও কিনেছেন। গ্রামে একটি মুদি দোকানও দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, ‘এখানে থেকে ঋণ নিলে বেশি সুদ দিতে হয় না। সপ্তাহ, মাসে বা বছরে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুবিধা থাকায় আমরা উপকার পেয়েছি।’
রাখালগাছি ইউনিয়নের খোলাশপুর গ্রামের আবু বক্কর বিশ্বাস বলেন, ‘একটি বাড়ি একটি খামার থেকে তিনি যে উপকার পেয়েছেন তা বলার মত নয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে বিভিন্ন কাগজপত্র, সুদ, ঘুষ দিতে হয়। আর সেখান থেকে তিনি সহজ শর্তে দুফায় ৪৫ হাজার ঋণ নিয়ে একটি গরু কিনেছেন। বর্তমানে গরুটির মূল্য ৮০ হাজার টাকা। এ প্রকল্পটি আরও ৫ বছর আগে যদি সরকার করতো তাহলে আমরা আরও বেশি উপকৃত হতাম।’
মস্তবাপুর গ্রামের মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘তিনি একটি বাড়ি একটি খামার থেকে ঋণ নিয়ে প্রথমে একটি গরু কেনেন। সেই গরু বিক্রি করে উন্নতজাতের কয়েকটি গরু কিনেছেন। এ সমিতি থেকে তিনি লাভবান হচ্ছেন। গ্রামের প্রায় ৬০ ব্যক্তি এ সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন কাজ করে স্ববলম্বী হয়েছেন।’
প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারী বদরুল আলম জানান, ইউএনও’র সার্বিক সহযোগিতায় ১১ জন মাঠ সহকারী, ২ জন সুপারভাইজার ও একজন সমন্বকারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রকল্পটিতে সাফল্য এসেছে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পের আওতায় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করা হবে। এছাড়া দরিদ্রদের সমিতির প্রকল্প আওতাভুক্ত করে তাদের দারিদ্রমুক্ত করা হবে। এছাড়া প্রকল্পটির স্থায়ী রুপদানে সরকার পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক নামে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। যে ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের সব দরিদ্র জনগণকেই দরিদ্রতা মুক্তিতে কাজ করবে।
উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান, প্রকল্পের যে লক্ষ্য তা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হত দারিদ্রদের ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা। সমবায় সমিতির ছোবল থেকে রক্ষা করে পিডি মহোদয় তার সুচিন্তা ও গভীর মননশীলতা প্রয়োগ করে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের পূর্ণ রুপদানের ক্ষেত্রে যে আবদান রাখছেন তা আজ বিশ্বের অনেক দেশই মডেল হিসেবে গ্রহণ করছে।
ইউএনও মানোয়ার হোসেন মোল্লা জানান, সঠিক প্রকল্প গ্রহণ, অক্লান্ত প্রচেষ্টা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কারণে তেমন কোনও অনিয়ন ও দুর্নীতি না থাকায় প্রকল্পটি ভালো করেছে। এছাড়া যে ব্যক্তি যে কাজে উপযোগী তাদের সেই ধরনের কাজ দেওয়া এবং উৎসাহ দেওয়াসহ আয়বর্ধন কাজে নিয়োগ করার মাধ্যমে প্রকল্প সফলতার মুখ দেখেছে।
/এসটি/








