
৮ সপ্তাহের মজুরিসহ ৫ দফা দাবিতে খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৭ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা গত চারদিন ধরে ধর্মঘট পালন করেছেন। ফলে মিলগুলোতে উৎপাদন সসম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। চারদিনের ধর্মঘটে মিলগুলোতে উৎপাদন ঘাটতি হয়েছে ৫৬০ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। এছাড়া আরও সোয়া কোটি টাকার পাট উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আটকে থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনার লিয়াজো কর্মকর্তা মোহাব্বত আলী বলেন, খুলনা যশোরের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে প্রতিদিন ১৪০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন হতো। সে হিসাবে ৪ দিনের ধর্মঘটের ফলে উৎপাদন ঘাটতি হয়েছে ৫৬০ মেট্রিক টন। আর সোমবারের উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য ছিল ১৫৪ মেট্রিক টন পাট। যা ৪দিন ওই অবস্থাতেই রয়েছে। প্রক্রিয়াজাত অবস্থায় থাকা পাট দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের পর পণ্য উৎপদনে মান কিছুটা খারাপ হয়। তবে, বিশেষ ব্যবস্থায় সে অবস্থার উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, স্টার, ক্রিসেন্ট ও প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিকদের ৮ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া। এই ৩টি মিলের শ্রমিকদের দু’সপ্তাহের মজুরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজেএমসির চেয়ারম্যান। সেক্ষেত্রে বিজেএমসির ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকরা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যবহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, উৎপদন বন্ধ থাকলে বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা করা কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে মিলগুলোর সুনাম নষ্ট হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল সিবিএ- নন সিবিএ ঐক্য পরিষদের আহবায়ক মো. সোহরাব হোসেন বলেন, শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ করার পরও ৮ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। এ অবস্থায় বকেয়া আদায়ে ধর্মঘটের বিকল্প ছিল না। শ্রমিকরা যদি মজুরি না পায়, তাহলে মিলে উৎপাদন অব্যহত রেখেও কোনও লাভ নেই। তাই শ্রমিকরা বকেয়া আদায়ে তৎপর।
তিনি বলেন, বায়ারদের কাছে সুনাম ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব শ্রমিকরা নিতে পারে, কিন্তু মিল কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের মজুরি নিয়মিত প্রদানের দায়িত্ব কেন নিতে পারে না। শ্রমিকরা না খেয়ে মিল চালু রাখতে পারে না।
প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলের প্রকল্প প্রধান এস এম মামুন উর রহমান বলেন, তার মিলে চার দিনে সোয়া শ মেট্রিক টন পাটপাত পণ্য উৎপাদন হতো। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে তা ঘাটতি হলো। এ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হল। স্তর ভেদে প্রক্রিয়াজাত করা পাট ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে উৎপাদন না হলে তা নষ্ট হয়ে যায়। ৩ দিনের মধ্যে উৎপাদন হলেও ওই পণ্যে গুণগত মান খারাপ হয়। কিন্তু শ্রমিকদের ধর্মঘট টানা চারদিন পার হলো। শুক্রবার মিল বন্ধ থাকে। আর শনিবার থেকে শ্রমিমদের ধর্মঘট আবারও চলবে বলে শ্রমিকরা ঘোষণা করেছে।
খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, দু সপ্তাহের মজুরি প্রদানের প্রস্তাব শ্রমিক নেতারা প্রত্যাখান করেছে। এ অবস্থায় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে তিনদিনের সময় নেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক নেতা প্লাটিনাম সিবিএ সভাপতি কাওসার আলী মৃধা বলেন, আগে মনে করা হতো বর্তমান সরকার শ্রমিক বান্ধব। কিন্তু শ্রমিকরা না খেয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এমন অবস্থায় পাটকল শ্রমিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই। ফলে রাজপথে আন্দোলন করেই তাদের দাবি আদায় করা ছাড়া কোনও বিকল্প নেই।
ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব জাকির হোসেন বলেন, পাট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে মিলগুলোকে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনমুখী করতে পাট খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, পে-কমিশনের ন্যায় অবিলম্বে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে শ্রমিকদের জন্য মজুরি কমিশন বোর্ড গঠন, ২০১৩ সালের ১ জুলাই ঘোষিত ২০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা প্রদানসহ ৫ দফা দাবি বাস্তবায়ন জরুরি।
প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, তাদের মিলে শ্রমিকদের ৭ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। অর্থ সংকটের কারণে শ্রমিক ও পরিবারের সদস্যরা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। দোকানের মালিকরা আর বাকিতে সদাই দিতে চায় না।
/এসটি/








