ডাকাতি করা ১৫০ ভরি স্বর্ণ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে খুন হয়েছেন মাগুরার যুবদল নেতা শাকের হোসেন। তাকে হত্যার জন্য ২০ লাখ টাকায় খুনি ভাড়া করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, ডাকাতির ঘটনায় পাওয়া স্বর্ণের হিসাব নিয়ে বিরোধের জেরেই শাকেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
বুধবার (০৪ নভেম্বর) দুপুরে মাগুরা পুলিশ লাইনসের ড্রিলশেডে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন।
গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে গুলিতে নিহত হন শাকের হোসেন। তিনি ওই পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার ছিলেন। পাশাপাশি মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। এ ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, গত ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মানিকগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী মজিবর রহমান ঢাকা থেকে তেজাবি স্বর্ণের কয়েকটি বার নিয়ে বাসে করে ঝিনাইদহের দিকে যাচ্ছিলেন। মাগুরা সদরের রামনগর এলাকায় পৌঁছালে মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল পুলিশ পরিচয়ে তাকে বাস থেকে নামিয়ে নেয়। পরে হুলিনগর এলাকার একটি নির্জন মেহগনিবাগানে নিয়ে তাকে মারধর করে ১৫০ ভরি ওজনের ১৪টি স্বর্ণের বার এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন।
ডাকাতির শিকার হওয়ার ২২ দিন পর গত ২৮ অক্টোবর মজিবর রহমান মাগুরা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তবে ডাকাতির ১৫ দিন পরই খুন হন শাকের। পুলিশের ভাষ্য, স্বর্ণ ডাকাতি ও শাকের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত। ডাকাতির স্বর্ণ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরেই তাকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডাকাতির পর থেকেই চক্রের সদস্যদের মধ্যে স্বর্ণের ভাগ নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। চক্রের মূল হোতা মারুফ হোসেন সহযোগীদের জানান, ডাকাতিতে মাত্র ছয়টি স্বর্ণের বার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তথ্যদাতা পক্ষকে তিনটি স্বর্ণের বার দেওয়া হয়েছে এবং বাকি আছে মাত্র তিনটি। কিন্তু বাকি আটটি স্বর্ণের বার মারুফ গোপনে নিজের কাছে রেখে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে প্রতারণা করেন।
পুলিশের ভাষ্য, মারুফের এই প্রতারণার বিষয়টি ধরে ফেলেন চক্রের অন্যতম সদস্য শাকের হোসেন। নিজের ভাগের স্বর্ণ ও টাকার হিসাব চেয়ে মারুফকে চাপ দিতে থাকেন তিনি। এ নিয়ে বিরোধ মেটাতে ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টার দিকে মাগুরা ট্রাক টার্মিনালে বৈঠকে বসেন শাকের, মাগুরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদ, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মারুফ হোসেনসহ চারজন।
বৈঠকে স্বর্ণের ভাগাভাগি নিয়ে শাকের ও মারুফের মধ্যে হাতাহাতি ও গালিগালাজ হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে গোলাম জাহিদ মধ্যস্থতা করেন। তিনি মারুফকে শাকেরকে কিছু টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং পরে বিষয়টি স্থায়ীভাবে সমাধানের আশ্বাস দেন। পরদিন ৮ অক্টোবর মারুফ শাকেরকে পাঁচ লাখ টাকা দেন। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হননি শাকের। স্বর্ণের বারের হিসাব ও নিজের ভাগের দাবিতে চাপ অব্যাহত রাখেন।
পুলিশ সুপার জানান, অতিরিক্ত চাপে কোণঠাসা হয়ে মারুফ একপর্যায়ে গোলাম জাহিদের সঙ্গে পরামর্শ করে শাকেরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় মারুফ গোলাম জাহিদকে ২০ লাখ টাকা দেন। পরদিন ১২ অক্টোবর ওই টাকার মধ্য থেকে ১৮ লাখ টাকা মাগুরার একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় নিজের হিসাবে জমা করেন গোলাম জাহিদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করা হয়। গত ২১ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারের সামনে শাকেরের মাথায় গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসানের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি বিশেষ দল কাজ শুরু করে। পরে হত্যা ও ডাকাতির দুই মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানায়, অভিযানে মারুফের ঘরের পেছন থেকে ৫১ ভরি ৯ আনা ওজনের পাঁচটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া আসামি মিল্টনের স্ত্রী মারুফার কাছ থেকে ১ ভরি ৭ আনা ওজনের একটি খণ্ডিত স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছে। ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল, একটি প্রাইভেট কার, গুলি এবং বুলেটের খালি কার্তুজও জব্দ করা হয়েছে।
শাকের হত্যা মামলায় গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রনি শিকদার (৩৮), বজরুক শ্রীকুন্ডি এলাকার শামীমা তাবাসসুম (৩১), ঝিনাইদহের স্বর্ণ ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদার (৫৫), বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. মারুফ হোসেন (৪৪), মো. গোলাম জাহিদ (৪৫) ও পারনান্দুয়ালী এলাকার বশির আলী।
এর মধ্যে গোলাম জাহিদ ও মারুফ হোসেনকে স্বর্ণ ডাকাতির মামলাতেও গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ওই মামলায় গ্রেফতার অন্য ব্যক্তিরা হলেন পারনান্দুয়ালী এলাকার মো. জুয়েল হোসেন (৪৭), তৌকির আহমেদ (২৫), মো. ফরিদ মণ্ডল (৫৯) এবং আনসার কলোনি এলাকার মো. মিল্টন মোল্যা (৩৫) ও তার স্ত্রী মারুফা আক্তার (৩২)।
পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, গ্রেফতার আসামি গোলাম জাহিদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শাকের হোসেনকে সরাসরি গুলি করা ভাড়াটে শুটারদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি স্বর্ণ উদ্ধার ও অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
এদিকে হত্যা ও ডাকাতির ঘটনায় গ্রেফতারের পর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম জাহিদ এবং পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. মারুফ হোসেনকে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করেছে।