তিন দফা বন্যায় কৃষি-মৎস্য খাত বিপর্যস্ত

হানিফ উল্লাহ আকাশ, নেত্রকোনা
২৮ আগস্ট ২০২০, ১৫:২১আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২০, ১৫:২১

বন্যাকবলিত এলাকা নেত্রকোনায় তিন দফা বন্যায় কৃষি ও মৎস্য খাতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমন বীজতলা নষ্টের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ আবাদ। চাষের পুকুর খামার থেকে ভেসে গেছে মাছ। নদী ভাঙনে অনেক জমি বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। ক্ষতি হয়েছে গ্রামীণ অবকাঠামোর; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক, সেতু ইত্যাদি। বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এর জের পড়েছে এসব খাতে। ফলে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে এই অঞ্চলের মানুষের। তবে এসব সমস্যা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের সহায়তা। 

বিপর্যয়ে কৃষি খাত

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান জানান,  জেলায় ১৩৮ হেক্টর আমন বীজতলা বন্যার পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ১৩ হেক্টর আউশ ধান ক্ষেত তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে নতুন করে ১৫ হেক্টর আমন বীজতলা করতে কৃষকদের বীজ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া সবজি উৎপাদন বাড়াতে ২ হাজার ২৪০ জন কৃষককে বসতবাড়ির উঁচু জমিতে আবাদের জন্যে বীজ ও সার দেওয়া হচ্ছে। তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা তাদের আমন আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা বলেছেন। 

জেলার কলমাকান্দা উপজেলার কনুরা গ্রামের মনতোষ বিশ্বশর্মা বলেন, ‘দুই দফায় আমার বীজতলা তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। এবার তৃতীয়বারের মতো বীজতলা করার চেষ্টা করছি। বাজারে বীজ সংকটের কারণে এখনও আমন ধানের বীজ সংগ্রহ করতে পারেনি।’

একই অবস্থার কথা জানিয়ে অন্য কৃষকেরা জানান, কৃষি বিভাগ থেকেও তারা বীজ ধান পাচ্ছেন না। এ কারণে আগামী আমন আবাদ নিয়ে বিপাকে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

বন্যায় তলিয়েছে পুকুর

তিন দফা বন্যায় জেলার সাত উপজেলার পুকুর ও খামারের মাছ ভেসে যাওয়ায় চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। জেলা মৎস্য বিভাগের হিসেবে ৩ হাজার মৎস্য চাষির ৪ হাজার ১৬৯টি পুকুর ও খামার বন্যায় তলিয়ে গেছে। এতে করে মাছ চাষিরা অন্তত ১২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯ কোটি ৯২ লাখ টাকার মাছ, এক কোটি ২৭ লাখ টাকার রেণু পোনা বানের পানিতে ভেসে গেছে। এক কোটি ৬০ লাখ টাকার পুকুর ও খামারের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফজলুল কবীর।

তিনি বলেন, ‘বন্যার সময় পরামর্শ দিয়ে মৎস্য বিভাগ চাষিদের পাশে ছিল। এখনও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছেন। ক্ষতি এড়াতে জাল দিয়ে পুকুর ও খামারের পাড় ঘিরে রাখা ও বড় মাছ দ্রুত বিক্রি করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেসব পুকুর ও খামার থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে, সেসব পুকুর ও খামারে চুন দিয়ে পানি পরিশোধন করতে হবে। এছাড়া এসব চাষিদের জন্য আপাতত সরকারি কোনও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না।’

ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক

জেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর কাঁচা-পাকা গ্রামীণ সড়কের ক্ষতি হয়েছে। ভেঙে গেছে বেশ কিছু বক্স কালভার্ট, আরসিসি বক্স। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্যালাসাইডিং ও ইউড্রেনের।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের নেত্রকোনা জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানান, বন্যার পানির তোড় ও পানিতে তলিয়ে ২৭৬ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪২ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বক্স কালভার্ট, আরসিসি বক্স, প্যালাসাইডিং ও ইউড্রেনের ২২৬ মিটার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। টাকার হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ হবে অন্তত এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তিনি জানান, পুরো পানি নামার পর দ্রুত এসব রাস্তা, সেতু মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নদী ভাঙন 

বন্যার সময় জেলার প্রধান নদীগুলো ফুলে ফেপে ওঠায় সুমেশ্বরী, কংশ ও ধনু নদীর ভাঙন দেখা দেয়। এতে করে তীরবর্তী বাজার, বসতবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়ে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান জানান, টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর পানি বেড়ে সুমেশ্বরীর দুর্গাপুরের ভবানীপুর এলাকায় ভবানীছড়া অংশে ভাঙন দেখা দেয়। উপজেলার গাওকান্দিয়া ইউনিয়নের কালিকাবর এলাকাতেও সুমেশ্বরীর ভাঙন দেখা দেয়। এছাড়া বারহাট্রায় কংশ নদের ভাঙন দেখা দেয় ফকিরের বাজার এলাকায় কর্ণপুরে। হাওরাঞ্চলের ধনু নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে খালিয়াজুরী উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রাম ও চাকুয়া ইউনিয়নের পাতরা গ্রাম।

আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ভাঙন রোধে কবলিত এলাকাগুলোতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজ চলছে।’

বন্যার্তদের সরকারি সহায়তা

তিন ধাপে এ পর্যন্ত এক লাখ ১৭ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে বলে জানান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম। তিন দফা বন্যায় জেলায় ৩৫০ মেট্রিক টন চাল, সাড়ে ১৬ কেজি করে ২ হাজার ৯০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, নগদ সাড়ে ৫ লাখ টাকা, শিশু খাদ্য বাবদ এক লাখ টাকা এবং গো খাদ্য বাবদ ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

/আইএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম