‘আমি মেডিক্যাল অফিসার এবং একজন চিকিৎসক ঠিক আছে, তবে ধোবাউড়ার গোয়াতলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য পরিচালক অফিসে সংযুক্তিতে এসেছি। এটাতো অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিস, এখানে পেশেন্ট রিলেটেড কোনও কাজ নাই, এখানে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কম্পিউটারে বিভিন্ন মেইল, রিপোর্ট চেক করি এবং প্রয়োজন মতো ডাটা এন্ট্রির কাজ করে ফরোয়ার্ড করে থাকি। আমাকে আনা হয়েছে এসব কাজ করানোর জন্য।’
এসব কথা বলছিলেন ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা গোয়াতলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত তথা মেডিক্যাল অফিসার ডা. শফিকুল ইসলাম। তিনি গোয়াতলা এলাকাবাসীকে চিকিৎসা সেবা না দিয়ে সংযুক্তি নিয়ে ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক কার্যালয়ে এসে কম্পিউটার ডাটা এন্ট্রির কাজ করছেন।
একজন চিকিৎসক রোগী না দেখে কেন কম্পিউটার অপারেটিং কাজ করছেন- এমন প্রশ্নে ডা. শফিক বলেন, ‘একজন মেডিক্যাল অফিসারের শুধু রোগী দেখাটাই কাজ না, আরও অনেক কাজ করার আছে সেই কাজগুলোই আমি করছি।’
শুধু ডা. শফিকুল ইসলাম নন, ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত এরকম প্রায় অর্ধশত চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন। এ কারণে ময়মনসিংহের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো চিকিৎসক সংকটে পড়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে। ফলে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে, ময়মনসিংহে ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকের মঞ্জুরি করা পদ রয়েছে ৩৭১টি। এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ২৩৩ জন। এর মধ্যে ৫০ জন সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন। এই হিসাবে ধোবাউড়া উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি করা পদ রয়েছে ২৮টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ৮ জন। এর মধ্যে ৬ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন। ফলে ২ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে এই উপজেলায় চিকিৎসা সেবা।
অনুরূপ ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ৩৪টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ৩২ জন। এর মধ্যে ৪ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
গফরগাঁও উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি করা পদ রয়েছে ২০টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ১৬ জন। এর মধ্যে ৬ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন। ফলে ১০ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে এই উপজেলায় চিকিৎসা সেবা।
গৌরীপুর উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি করা পদ রয়েছে ৩১টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ১৬ জন। এর মধ্যে ২ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
হালুয়ঘাট উপজেলায় চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৩টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ১১ জন। এর মধ্যে ৪ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন। ফলে ৭ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে এই উপজেলায় চিকিৎসা সেবা।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ৩০টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ১৮ জন। এর মধ্যে ১ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
মুক্তাগাছা উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ ২৯টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ২০ জন। এর মধ্যে ৬ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
নান্দাইল উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ৩৩টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ১২ জন। এর মধ্যে ৩ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
ফুলপুর উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ২৯টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ১৮ জন। এর মধ্যে ৩ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
তারাকান্দা উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ২১টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ২০ জন। এর মধ্যে ৬ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
ত্রিশাল উপজেলায় চিকিৎসকের পদ রয়েছে ২৮টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ২০ জন। এর মধ্যে ৩ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
ভালুকা উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ৩৪টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ২২ জন। এর মধ্যে ২ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ২১টি, এর বিপরীতে পদায়ন আছেন ২০ জন। এর মধ্যে ৮ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন।
ধোবাউড়া গোয়াতলা এলাকার বাসিন্দা হাবিবুল ইসলাম জানান, গোয়াতলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসক অন্য জায়গায় দায়িত্ব পালন করায় এলাকার গরিব অসহায় মানুষ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রোগীরা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে ফিরে যান।
ধোবাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়া রোগী মাদ্রাসা শিক্ষক আনিসুর রহমান জানান, দুই জন চিকিৎসক দিয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা চলছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য না। দ্রুত চিকিৎসক সংখ্যা বাড়াতে হবে।
সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. উৎপল দাস জানান, ধোবাউড়া উপজেলায় চিকিৎসকের মঞ্জুরি পদ রয়েছে ২৮টি, এর বিপরীতে পদায়নকৃত আছেন ৮ জন। এর মধ্যে ৬ জন চিকিৎসক সংযুক্তি নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করছেন। ফলে ২ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে এই উপজেলার চিকিৎসা সেবা।
তিনি আরও জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে আউটডোরে ৫০০ রোগী চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে। হাসপাতালে ৬০-৭০ জন রোগী ভর্তি থাকে। ২ জন চিকিৎসক দিয়ে এই সেবা দেওয়াটা মোটেই সম্ভব হচ্ছে না। সংযুক্ত নিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করা চিকিৎসকদের নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা গেলে সেবা কিছুটা দেওয়া যেত। এছাড়া শূন্য পদ পূরণ করাটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংযুক্তির আদেশ বাতিল করে তাদের নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার দাবি করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আশিকুর রহমান জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। এটা কোনোভাবেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্প্রিরিটকে ধারণ করে না। দ্রুতই শূন্য পদ পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চিকিৎসকদের সংযুক্তির আদেশ বাতিল করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরকে অবহিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি চিকিৎসক নিয়োগের ব্যবস্থা করে শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে।








