সরকারি নিয়ম না মেনে নগদ টাকায় রেণুপোনা বিক্রি করছ বিএফআরআই

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
২৭ জুন ২০২৬, ২০:০৮ আপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ২০:০৮

ময়মনসিংহে সরকারি নিয়ম না মেনে ব্যাংকিং লেনদেন বাদ দিয়ে চাষিদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে রেণুপোনা বিক্রি করছন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) কর্মকর্তারা।

চাষিরা বলছেন, নগদ টাকা নিয়ে রেণুপোনা বিক্রি করায় এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি করার সুযোগ আছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক বলছেন, নগদ টাকা নিয়ে সরাসরি রেণুপোনা বিক্রির সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বা সরকারি হ্যাচারি থেকে রেণুপোনা সংগ্রহের সরকারি নিয়ম হলো সুনির্দিষ্ট চালানের মাধ্যমে ব্যাংক ড্রপ বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করা। কোনও কারণে ব্যাংকিং সিস্টেম (যেমন: ট্রেজারার চালান, পে-অর্ডার) এড়িয়ে নগদ বা সরাসরি ক্যাশে টাকা পরিশোধ করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি সরকারি আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে।

ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত রসিদ বা চালান সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দিলে রেণুপোনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিটি প্রজাতির রেণুপোনা নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রির বিধান রয়েছে। পে-অর্ডার বা চালানের মাধ্যমে টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে (ট্রেজারি) জমা হয়। এটি এড়িয়ে নগদ টাকা নিলে সরকার তার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। সরকারি কর্মকর্তারা ব্যাংকিং প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে নিজের পকেটে নগদ টাকা নিলে তা সরাসরি আর্থিক দুর্নীতি বা আত্মসাতের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িত কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

নগদ টাকা নিয়ে রেণুপোনা বিক্রি করায় এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি করার সুযোগ আছে

বিএফআরআইর হ্যাচারির উৎপাদিত রেণুপোনার চাহিদা থাকায় চাষিরা নেওয়ার জন্য হ্যাচারি প্রাঙ্গণে এসে ভিড় জমান প্রতিদিন। সরেজমিনে দেখা গেছে, রেণু নেওয়ার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিরা এসেছেন। হ্যাচারির কার্যালয়ে দেখা যায় ল্যাব টেকনিশিয়ান শাহাদাত হোসেন চাষিদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিচ্ছেন এবং রেণুপোনা সংগ্রহের জন্য স্লিপ দিচ্ছেন। ওই স্লিপ নিয়ে চাষিরা রেণুপোনা বুঝে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।

ময়মনসিংহ সদরের পরানগঞ্জ এলাকার মাছচাষি হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রায় ১৬ বছর ধরে মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। বিএফআরআইয়ের হ্যাচারি থেকে রেণু নিয়ে পুকুরে চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছি। আগে এখানকার রেণু সংগ্রহ করার জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হতো। ব্যাংকের চালান বিএফআরআই অফিসে এসে জমা দিলে কর্মকর্তারা রেনুপোনা আমাদের বুঝিয়ে দিতেন। কিন্তু গত দুই বছর ধরে ব্যাংকিং সিস্টেম বাদ দিয়ে হ্যাচারির কর্মকর্তারা নগদ টাকা নিয়ে আমাদের রেণুপোনা দিচ্ছেন।’ 

আরেক মাছচাষি মেহেদী হাসান বলেন, ‘আগে ব্যাংকিং সিস্টেমই ভালো ছিল। নগদ টাকায় সরকারি অফিসে মাছের পোনা বিক্রি করা মোটেও ঠিক নয়। কারণ এতে অনিয়ম ও দুর্নীতি করার সুযোগ তৈরি হয়।’

নগদ টাকা নিয়ে চাষিদের রেণুপোনা সরবরাহ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিএফআরআইর ল্যাব টেকনিশিয়ান শাহাদাত হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাষিরা সরাসরি আমাদের কাছে এসে নগদ টাকা জমা দেন। এরপর তাদের আমরা একটা রসিদ দিই। তারা রেণুপোনা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। শুনেছি আগে ব্যাংকিং সিস্টেমে টাকা জমা দিয়ে রেণুপোনা সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই আমরা চাষিদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিচ্ছি। পরে সেই টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে থাকি।’

চাষিরা সরাসরি এসে নগদ টাকা জমা দিয়ে রেণুপোনা নিয়ে যাচ্ছেন

হ্যাচারির ইনচার্জ ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আসাফ উদ দৌলা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাষিরা তেমন সচেতন নন। তারা ব্যাংকে কার্যক্রম করতে চায় না। এ কারণে আমরা নগদ টাকা নিয়ে তাদের একটি স্লিপ দিই। পরে আমরা সেই টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে থাকি। এখানে দুর্নীতি করার কোনও সুযোগ নেই।’

বিএফআরআইর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, সাবেক ডিজি স্যারের সময়ে যেকোনো হ্যাচারির রেণুপোনা বিক্রি করার সময় চাষিদের আগে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে চালান নিয়ে আসতে হতো। ওই চালান দেখে হ্যাচারি থেকে রেণুপোনা সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমান ডিজি যোগদানের পর থেকে ব্যাংকিং সিস্টেম বাদ দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে রেণুপোনা চাষিদের দেওয়া হচ্ছে।’

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের জেলা সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ‘ব্যাংকিং সিস্টেম বাদ দিয়ে সরাসরি নগদ টাকা নিয়ে রেণু বিক্রি করায় চাষিদের মাঝে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি করার সুযোগ আছে। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আগের ডিজিদের মতো ব্যাংকিং সিস্টেমে রেণু বিক্রি করা খুব জরুরি।’

এ ব্যাপারে বিএফআরআইর মহাপরিচালক অনুরাধা ভদ্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হ্যাচারিতে রেণুপনা বিক্রি ব্যাংকিং সিস্টেমেই হচ্ছে। নগদ টাকা নিয়ে রেণুপোনা বিক্রি করার কোনও সুযোগ নেই।’

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
সামুদ্রিকের পাশাপাশি মিঠাপানির মাছ রফতানির লক্ষ্য সরকারের
জেলের জালে ধরা পড়লো ২৪ কেজি ওজনের এক মাছ
একলাফে ইলিশের মণে দাম কমেছে ২০ হাজার টাকা
সর্বশেষ খবর
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
দুই মন্দিরে চুরির ঘটনায় চার জন গ্রেফতার 
সরকারি দায়িত্বে বিএনপির শীর্ষ নেতারা, মাঠের শূন্যতা পূরণ হবে কীভাবে
সরকারি দায়িত্বে বিএনপির শীর্ষ নেতারা, মাঠের শূন্যতা পূরণ হবে কীভাবে
অস্ত্র সমর্পণে ইরানি গোষ্ঠীগুলোকে নতুন সময় দিলো ইরাক
অস্ত্র সমর্পণে ইরানি গোষ্ঠীগুলোকে নতুন সময় দিলো ইরাক
বাংলামোটরে চাঁদার দাবিতে উত্তেজনা, মাথায় আঘাতের পর ফাঁকা গুলি
বাংলামোটরে চাঁদার দাবিতে উত্তেজনা, মাথায় আঘাতের পর ফাঁকা গুলি
সর্বাধিক পঠিত
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি