ফসলি জমিতে সোলার প্রকল্পের পাঁয়তারা, এমপি বাচ্চু ও ইউএনওর বিরুদ্ধে স্মারকলিপি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫৮ আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ২৩:০৫

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ঝালপাজা ও নন্দীপাড়া মৌজার উর্বর তিন ফসলি কৃষিজমিতে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, ভুয়া দলিল দিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী শাখা হতে ব্যাংক লোনের মাধ্যমে কৃষি জমি মর্টগেজ দিয়ে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্যানেল স্থাপনের চেষ্টা চলছে। এ উদ্যোগ বন্ধ এবং বিষয়টি তদন্তের দাবিতে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তারা। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে স্থানীয় কৃষকরা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।

কৃষকদের দাবি, ঝালপাজা ও নন্দীপাড়া মৌজার বিস্তীর্ণ জমি অত্যন্ত উর্বর এবং এসব জমিতে বছরে তিনটি পর্যন্ত ফসল উৎপাদন হয়। এলাকার কয়েক শ কৃষক পরিবারের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা এই কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি ওই এলাকায় কয়েকটি মসজিদ ও মাদ্রাসা রয়েছে।

স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী একটি মহল এসব কৃষিজমিতে বাণিজ্যিক সোলার প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভুয়া দলিল করে জমি ব্যবহারের অনুমোদন ও অনাপত্তি সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। 

কৃষকেরা আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা তাদের আপত্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফিরোজ হোসেন ও স্থানীয় কৃষি বিভাগের একজন কর্মকর্তা প্রকল্পের অনুকূলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সম্প্রতি ইউএনওসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় কৃষকরা তাদের জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানান। তাদের আপত্তি আমলে না নিয়ে উল্টো তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয় এবং সরকারি সিদ্ধান্ত ও সংসদ সদস্যের প্রভাবের কথা বলে ভয়ভীতি দেখানো হয়।

পাঁচ শতাধিক কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা

কৃষকদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঝালপাজা ও নন্দীপাড়া মৌজার বিস্তীর্ণ তিন ফসলি জমি কৃষিকাজের বাইরে চলে যাবে। এতে প্রায় পাঁচ শতাধিক কৃষক পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তাদের দাবি।

কৃষকদের ভাষ্য, কৃষিজমি হারালে শুধু তাদের আয় কমবে না, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনও ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের বড় পরিসরের অবকাঠামো নির্মাণের কারণে আশপাশের কৃষিজমি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও স্থানীয় পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

স্মারকলিপিতে কৃষকেরা দাবি করেছেন, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী উর্বর কৃষিজমি ও ফসলি জমি সংরক্ষণ করে অকৃষি, অনুর্বর বা পতিত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। তাই তিন ফসলি কৃষিজমি ব্যবহার করে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জমির শ্রেণি, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় কৃষকের স্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাদের দাবি, প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃতি ও ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং কৃষকদের মতামত যাচাই করে দেখা হোক।

স্মারকলিপিতে কৃষকেরা জেলা প্রশাসনের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—তিন ফসলি কৃষিজমিতে সোলার প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ তদন্ত করা, প্রকল্পের অনুকূলে NOC দেওয়ার প্রক্রিয়া থাকলে তা স্থগিত করা এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তভাবে বিষয়টি যাচাই করা। একই সঙ্গে কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

কৃষকদের ভাষ্য, উন্নয়ন বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বিরোধিতা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উর্বর জমি নষ্ট করে নয়, বরং পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদনের ওপর কম প্রভাব পড়ে—এমন বিকল্প জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত।

এ বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। 

এ ব্যাপারে ভালুকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফিরোজ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার সারা দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলায় সরকারিভাবে সোলার প্যানেল নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য প্রায় দেড়শ একর জমির প্রয়োজন। এই সোলার প্যানেল থেকে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা রয়েছে। ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের সম্ভাব্য যে জায়গাটি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি পাহাড়ি উঁচু জায়গা। তবে কৃষকরা যে অভিযোগ করেছেন, সেটি আপনারা সাংবাদিকরা এসে সরেজমিনে দেখে যান আসলে অভিযোগ ঠিক কিনা। এরপরে প্রয়োজনে আবার কথা বলবো।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দুর্নীতির মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে ৩৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ
দুর্নীতির মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে ৩৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ
রাত পোহালেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন, প্রস্তুত ১৮৫ কেন্দ্র
রাত পোহালেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন, প্রস্তুত ১৮৫ কেন্দ্র
উচ্চ বেতনে চীনে নেওয়ার কথা বলে বাসায় আটকে নির্যাতন, উদ্ধার ১২ নারী
উচ্চ বেতনে চীনে নেওয়ার কথা বলে বাসায় আটকে নির্যাতন, উদ্ধার ১২ নারী
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী