ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সন্দেহভাজন জঙ্গি নিবরাস ইসলাম পরিচয় গোপন করে ‘সাঈদ’ নামে ঝিনাইদহ শহরে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। এ খবর প্রকাশ হওয়ায় ঝিনাইদহের প্রশাসন ও সাংবাদিকদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় এরই মধ্যে ওই বাসার মালিক ও তার দুই ছেলেসহ ৫ জনকে আটক করে নিয়ে গেছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর একটি বিশেষ দল। তবে সে খবর অস্বীকার করে ঝিনাইদহ র্যাব-৬ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন কোনও তথ্য নেই।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নিবরাস ইসলামের সঙ্গে মোস্তফাসহ আরও ৭/৮ জন যুবক ওই ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ৩০ নম্বর কমিশনার নজরুল ইসলাম সড়কে ২১১ নম্বর বাসাটি নিবরাসকে ভাড়া পাইয়ে দিতে সহায়তা করেন বাসার পাশে অবস্থিত ঝিনাইদহ হামদহ সোনালীপাড়া মসজিদের ইমাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়া বিভাগের ছাত্র রোকনুজ্জামান। প্রথমে সেখানে দুজন উঠলেও কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে আরও ছয়জন ওঠে। গত ২৮ জুন বাড়িতে ঈদ করার কথা বলে নিবরাসসহ অন্যরা পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে চলে যায়। বাড়ির মালিক সেনাবাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট কওছার আলী মোল্লার স্ত্রী বিলকিস নাহার এ সব তথ্য জানান। তিনি ছবি দেখে নিরবাসকে শনাক্তও করেন। তবে তাকে তিনি ‘সাঈদ’ নামে চিনতেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রশ্নের জবাবে বিলকিস নাহার বলেন, গুলশান হামলায় সন্দেহভাজন জঙ্গি নিবরাস ইসলামই সাঈদ। আমি ছবি দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। ছবির সঙ্গে ওর চেহারার মিল রয়েছে। নিবরাস ইসলাম ওরফে সাঈদ গত ২৮ জুন পর্যন্ত চার মাস ওই ভাড়া বাড়িতে ছিলেন।
বিলকিস নাহার বাংলা ট্রিবিউনকে আরও জানান, মার্চ মাসে মসজিদের ইমাম রোকনুজ্জামান ছাত্র পরিচয়ে সাঈদ (নিবরাস) নামের ওই ছেলেটিকে ২ হাজার তিনশ টাকায় তার বাসা ভাড়া করে তুলে দেন। প্রথমে সাঈদ ও মোস্তফা নামের দুই যুবক বাসাটিতে ওঠে। পরে সেখানে আরও ছয়জনসহ মোট আটজন মেস করে থাকতো। পার্শ্ববর্তী এলাকার এক নারী তাদের রান্না করে দিত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিবরাসসহ ওই মেসের অন্য সদস্যরা মোটরসাইকেলে দিনে রাতে একাধিকবার যাতায়াত করতো। তারা প্রায় দিনই মধ্যরাতে মোটর সাইকেলে মেসে ফিরতো।
মেস সংলগ্ন মসজিদটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি শরাফত হোসেন জানান, তিনি মেসের ছেলেদের নামাজ পড়তে দেখেননি। তবে ইমাম রোকনুজ্জামান সম্পর্কে তিনি বলেন, ইমাম সাহেব কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এক বছর আগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে তাকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, ঈদের আগের দিন রাতে মসজিদের ইমাম রোকনুজ্জামান ও সোনালী পাড়ার হাফেজ সাব্বির আহম্মেদ রবকে র্যাব ও পুলিশ তাদের বাসায় নিয়ে আসে। সেখানে তার স্বামী কওসার আলী, বড় ছেলে বিনছার আলী, ছোট ছেলে বেনজীর আলী ও তাকে পাশের রুমে আটকে রেখে তাদের বাসাসহ ভাড়া দেওয়া মেসে ব্যাপক তল্লাশি করে এবং তার বাসা থেকে ছেলের ব্যবহৃত ল্যাপটপ, পেনড্রাইভ, হার্ডডিক্স, মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।
এসময় তার স্বামী ও দুই ছেলেসহ ওই ৫ জনকে ধরে নিয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ টিম। তাদের এখনও ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
বিলকিস নাহার আরও দাবি করেন, ঈদের দিন (৭ জুলাই) তাকেও ঝিনাইদহ র্যাব ক্যাম্পে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার শেখ জানান, এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তিনি বলেন, এদের কে আটক করেছে, কেন করেছে বলতে পারছি না।
ঝিনাইদহ সদর সার্কেলের এএসপি গোপীনাথ কানজিলালও জানান, ওই ঘটনার বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।
র্যাব-৬ ঝিনাইদহ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মুনির জানান, তারা কাউকে আটক করেননি। এ সংক্রান্ত কোনও তথ্যও তাদের কাছে নেই। তবে বাইরের কোনও টিম এসে তাদের আটক করলে করতেও পারে।
এদিকে, ঝিনাইদহ শহরের হামদহ সোনালীপাড়ার বাসিন্দা স্থানীয় সরকারি কেসি কলেজের ছাত্র নওর জামিল বর্ষণ জানান, সাঈদ তাদের পাড়ায় চার মাসের বেশি সময় ভাড়া ছিল। সেসময় সে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তাদের জানিয়েছিল। এ সময় সাঈদ তাদের সঙ্গে ফুটবলও খেলেছে। সে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারতো। এ জন্য সবাই তাকে পছন্দ করত।
বর্ষণ আরও জানান, ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ছবি প্রকাশের পর আমরা তাজ্জব হয়ে যাই। তাদের সঙ্গে খেলা করা সেই সাঈদই নিবরাস ইসলাম বলে তারা ছবি দেখে জানতে পারেন।
/টিএন/
আরও পড়ুন:
জঙ্গি তৎপরতায় এগিয়ে নর্থ-সাউথ, বুয়েট ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়








