প্রবল বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামে আবারও বাড়তে শুরু করেছে ব্রহ্মপুত্র,দুধকুমার, ধরলা, তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি। গত চারদিনের টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রতিটি নদ-নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বাড়ায় আবারও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এসব অঞ্চলের মানুষ। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলছে নদী ভাঙন। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদী তীরবর্তী চর ও দ্বীপ চরের বাসিন্দারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকদিন আগের বন্যার ক্ষতি সামলে না উঠতেই আবারও প্লাবিত হয়েছে ছয় উপজেলার শতাধিক গ্রাম। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলা নদীসহ শাখা নদীগুলোর। ফলে সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর উপজেলার দ্বীপচর ও নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো পানিতে তলিয়ে আছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। গ্রামীণ সড়কগুলো তলিয়ে থাকায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এরই মধ্যে প্লাবিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন দুর্গত মানুষ। নৌকা এবং কলা গাছের ভেলা এখন তাদের চলাচলের একমাত্র অবলম্বন। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে যাত্রাপুরের ঘনশ্যামপুর গ্রামের শতাধিক পরিবার এখন ভিটেহারা। এখনও ভাঙনের মুখে রয়েছে অর্ধশতাধিক পরিবার। টিকে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টায় দিনানিপাত করলেও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের তীব্রতায় একের পর এক পরাজিত হচ্ছেন এই গ্রামের বাসিন্দারা।
ঘনশ্যামপুরের ফিরোজা বেগমের প্রতিবেশী নাজমা ইতোমধ্যে নদী ভাঙনে ভিটে হারিয়ে পরিবারের আট সদস্যদের নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও আশ্রয় নেওয়া সেই বাড়িটিও আর দু’চারদিনের মধ্যেই নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। আর ফিরোজা বেগমের থাকার ঘরের একাংশ নদী গর্ভে চলে গেছে। অন্যত্র ভিটে মাটি না থাকায় ক্ষীণ প্রত্যাশা নিয়ে তবুও বাড়িতেই থাকছেন যদি ব্রক্ষপুত্র তাদের ছাড় দেয়! কিন্তু ছাড় যে দিবেনা সেটা তিনিও জানেন, তবুও মিছে আশা নিয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে অপেক্ষা টিকে থাকার।
ফিরোজা বলেন, ‘থাকার ঘরটুকু ছাড়া আর কোনও জায়গা নাই, নদীর ভাঙনে সেটাও শ্যাষ হবার লাগছে। কেমন করি বাঁচি থাকবো জানিনা।’
অন্যদিকে, একই গ্রামের ব্রহ্মপুত্র তীরের নূর বখ্ত ও সাজিরনের আঙিনার সীমানা প্রাচীরের কাছে নদী এসে তার ভাঙনের দাপট দেখাচ্ছে। সংগ্রামী এই দম্পতি নিজেদের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে যুগলবন্দি হয়েই নেমে পড়েছেন ভাঙন প্রতিরোধে। বাজার থেকে কিনে আনা ফাঁকা সিমেন্ট ব্যাগে বালু ভরে সেই ব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধের শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র গতিপথ না বদলালে তাদেরও রক্ষা নেই।
নূর বখ্ত বলেন, শ্যাষ চেষ্টা করি দেখি, যদি নদীর দয়া হয়! কিন্তু তার স্ত্রী সাজিরনের মুখে নিরাশার অন্ধকার।
ভাঙন রোধে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনও পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এভাবেই ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ঘনশ্যামপুরের একের পর এক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে ঘরহারা উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ২নং যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৪৮৭ শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার এই বিদ্যাপিঠটি যেকোনও সময় নদী গর্ভে বিলীন হতে পারে। নদী ভাঙনে পড়ে বিদ্যালয়টির মূল ভবনের এক কোণের মাটি সরে গিয়ে ভবনটি শূন্যে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ভাঙন প্রতিরোধে কোনও ব্যবস্থা নেই প্রশাসনের।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আ. রশিদ জানান, ভাঙনের হাত থেকে বিদ্যালয়টিকে রক্ষা করার জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন জানালেও এখনও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এদিকে, যাত্রাপুর ইউনিয়নের বলদিপাড়া ও গারুহারা গ্রামের সংযোগ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীদের নৌকায় করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষগুলোর অনেকে ত্রাণ সহায়তা চাচ্ছেন। কিন্তু বন্যার্তদের মাঝে এখনও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেনি স্থানীয় প্রশাসন। ফলে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বলদিপাড়ার নাদের হোসেন স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে পানিবন্দি অবস্থায় এবারের ঈদ উদযাপন করেছিলেন। এরপর ৫/৬ দিন স্বাভাবিক থাকলেও আবারও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে তার পরিবার। ঘরের ভিতর পানি ওঠায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এই দিনমজুর। কিন্তু কোনও ত্রাণ সাহায্য মেলেনি তার।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন,‘আমার ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকা ব্রহ্মপুত্রের চর। চরাঞ্চলের সবগুলো ঘর-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে আছে প্রায় দুই হাজার পরিবারের মানুষ। কিন্তু দু’দফা বন্যা হলেও এখনও কোনও ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ায় তাদের দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
জরুরি ভিত্তিতে বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সহায়তা না দিলে মানবিক বিপর্যয় হতে পারে বলেও জানান তিনি।
বন্যা দুর্গতদের ত্রাণ সহায়তা না দেওয়ার কথা স্বীকার করে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পনির উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘আমাদের হাতে ত্রাণ সামগ্রী প্রস্তুত রয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাপারে এখনও আমরা প্রতিবেদন পাইনি। দু’এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন হাতে পেলে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।’
২নং যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করেছি। তারা (পানি উন্নয়ন বোর্ড) বিষয়টিতে ইমারজেন্সি ঘোষণা করেছেন বলে জানিয়েছেন।’ দ্রুতই এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ৫৬ সেন্টিমিটার, তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৪ সেন্টিমিটার, দুধকুমারের পানি নুন খাওয়া পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরও পড়ুন:
‘চিন্তা করো না, জিহাদের জন্য আমি ইরাকে আছি’
রিভার্জ চুরি: বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িতরা চিহ্নিত, দালিলিক প্রমাণ হাতে নিয়েই গ্রেফতার
/বিটি/








