গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী ইউনিয়নের সিংড়িয়া এলাকায় শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ব্রহ্মপুত্র বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২শ’ মিটার ধসে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে অন্তত ২০টি গ্রাম। ভেসে গেছে ঘরবাড়ি ও ধান, চাল, মালামাল ও গবাদিপশু।
প্লাবিত গ্রামগুলো হলো সিংড়িয়া, উদাখালি, উত্তর উদাখালি, রতনপুর, বুড়াইল, উত্তর বুড়াইল, পূর্ব ছালুয়া, পশ্চিম ছালুয়া, হরিপুর, উত্তর কাঠুর, দক্ষিণ কাঠুর, খামার বোয়ালি, তালুক বুড়াইল, সারিয়াকান্দি, মাছের ভিটা, নীলের ভিটা ও চুনিয়াকান্দি, গজারিয়া, কঞ্চিপাড়া, উড়িয়া, সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ও বোয়ালী।
২০ গ্রামের প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গাইবান্ধা-ফুলছড়ি সড়কের বিভিন্ন স্থান তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এদিকে বাঁধ ভেঙে প্রবল পানির স্রোতে হাজিরহাট এলাকার পূর্ব পাশের একটি ব্রিজ ভেঙে পড়েছে ও বাদিয়াখালি-উদাখালি এবং উড়িয়া সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কুমার সরকার জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পানির চাপ বেড়ে যায়। এতে সিংড়িয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। বাঁধটির ভাঙন ঠেকাতে কাজ শুরু করা হবে। তবে স্থানীয় লোকজনকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও জানান, শনিবার পানি কমতে শুরু করেছে। ঘাঘটের পানি ৯ সে.মি কমে বিপদসীমার ৬১ ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১২ সে.মি কমে বিপদসীমার ৭৮ সে মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অপরদিকে বন্যার পানির তোড়ে ফুলছড়ি উপজেলার চন্দ্রনস্বর গুচ্ছ গ্রামটি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে বন্যা কবলিত গৃহহীন পরিবারগুলো ফুলছড়ি উপজেলা খাটিয়ামারির চরের চন্দনস্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে, যাপন করে চলেছে মানবেতর জীবন।
ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বাকী সরকার জানান, উদাখালী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য রাজা মিয়ার বাড়ির অদূরে ব্রহ্মপুত্রের পানির চাপে রাত ১০টার দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিংড়িয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার ভেঙে যায়। এসময় অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বাঁধ ধসে যাওয়ার ফলে এলাকার মানুষ পানির শব্দে ঘুম থেকে উঠে আর্তচিৎকার করতে করতে জীবন বাঁচানোর জন্য দিগবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন।
পানির তীব্র স্রোতের কারণে ধান-চাল আসবাবপত্রসহ যাবতীয় মালামাল পানিতেই রেখে উঁচু জায়গায় চলে আসেন স্থানীয়রা। এদিকে পানির তীব্র স্রোতে ওই এলাকার মানিক, নিখিল ও মোজা আলীসহ বেশ কয়েকজনের বাড়ি ও গবাদি পশু স্রোতে ভেসে যায় এবং ৫০ জনের বেশি মানুষ পানির স্রোতের মুখে আটকা পড়েন। পরে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। উদ্ধার কাজে অংশ নেন স্থানীয় জনগণ, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ প্রশাসন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ ঘটনার পর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস বা কোনও উদ্ধারকারী দল সেখানে যায়নি। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফেলতির কারণে বাঁধটি ভেঙে যায়।
উদাখালি ইউনিয়ন পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, বন্যায় বাঁধটির একাধিক অংশ হুমকির মুখে পড়েছিল। স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধটি রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে আসছিল এলাকাবাসী। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত পানির চাপে বাঁধটি রক্ষা করা সম্ভব হলো না।
অপরদিকে, কয়েকদিন ধরে গাইবান্ধার নদ-নদের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রাবাহিত হচ্ছে। এতে করে গত দুই সপ্তাহ থেকে জেলার পানিবন্দি আড়াই লাখ মানুষের দুর্ভোগ ক্রমে বেড়েই চলছে। বন্যার্ত মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানির প্রবল স্রোতে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের চন্দ্রনস্বর গুচ্ছ গ্রামের ৩২০টি পরিবার ঘরবাড়ি ও সহায় সম্বল হারিয়ে খাটিয়ামারির চরের চন্দনস্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয় নেওয়া মানুষ গুলোর দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। তাদের রান্না করে খাবার মতো ব্যবস্থা নেই। অনেক পরিবারের সদস্যদের অর্ধাহার ও অনাহারে দিন কাটছে। গো-খাদ্যের অভাবে গবাদিপশু নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়েছেন তারা। কেউ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার কোনও ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে গর্ভবর্তী মহিলাদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। পাঁচদিন হলো বন্যা ও নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজ নিতে আসেনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমনটাই অভিযোগ এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের।
এদিকে গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের পৌর এলাকার কুটিপাড়া, ডেভিডকোম্পানীপাড়া ও গোদারহাটের ৮টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাঁধ দিয়ে এখনও পানি চোয়াচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং লোকজন বাঁধ পাহারা দিচ্ছে। এ নিয়ে শহরবাসী আতঙ্কে রয়েছেন।
ফজলুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জালাল জানান, ওই পরিবারগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনও ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাদের জরুরি পুনর্বাসন প্রয়োজন।
সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু চৌধুরী জানান, গাইবান্ধার বন্যা কবলিত এলাকায় ১২০টি চিকিৎসক দল স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত রয়েছে।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শামসুল আজম বলেন, বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিন্তু চাহিদা অনেক বেশি থাকায় অতিরিক্ত ত্রাণের চাহিদা জানিয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
ভিডিও দেখুন:
/এইচকে/
আরও পড়ুন: জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত: ট্রেন চলাচল বন্ধ








