হিজবুত তাহরীরের কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে গ্রেফতার হওয়া এসএম সাদিকুর রহমান পলাশকে নির্দোষ দাবি করেছে তার পরিবার। স্থানীয়দের ভাষ্যও একই। তাদের দাবি, পলাশ কোনও অপরাধমূলক তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না।
পলাশের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি মো. শাহজাহান আলী দাবি করেন, তার বড়ছেলে পলাশ ষড়যন্ত্রের শিকার। তিনি জানান, পলাশ ২০০৩ সালে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পেয়ে এসএসসি পাস করে। এরপর ঢাকা নটরডেম কলেজে ভর্তি হয় সে। সেখানে লেখাপড়ার সময় সে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে বাড়িতে এনে দু’বছর চিকিৎসা করানো হয়। তৃতীয় বছরে সে এইচএসসি পরীক্ষা দেয় এবং ফের ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পায়। এরপর সে ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। কিন্তু স্নাতক শেষবর্ষে (২০১১) সে ফের মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তাকে আবারও বাড়িতে এনে চিকিৎসা করানো হয়। ২০১২ সালে পলাশ চিকিৎসার জন্য ঢাকা যায়। বাস থেকে নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁটাবন এলাকায়। ওইসময় পুলিশ কিছু ছেলেকে ধাওয়া করছিল। ঘটনাটি সে দাঁড়িয়ে দেখার সময় পুলিশ তার হাতে একটি পোস্টার ধরিয়ে দিয়ে হিজবুত তাহরীর সদস্য হিসেবে শাহবাগ থানায় মামলা করে। পরে তার অসুস্থতার কাগজপত্র দেখানো হলে আদালত তাকে জামিন দেন।
এরপর লেখাপড়া শেষ করে পলাশ বিসিএস-এর মাধ্যমে ঝিনাইদহের সরকারি নূরুন নাহার কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে।
পলাশের বাবা বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার সিআইডি পুলিশের আসগর নামে এক কর্মকর্তা তাদের লেবুতলা ইউপি চেয়ারম্যান আলিমুজ্জামানকে ফোন করে পলাশের বিষয়ে জানতে চান। পরে চেয়ারম্যান আমাকে ফোন করে ছেলেকে সিআইডি অফিসে নিয়ে যেতে বলেন। কারণ, সিআইডি নাকি পলাশের কাগজপত্র দেখবেন এবং আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’
শাহজাহান আলী জানান, দুপুরে তিনি পলাশকে নিয়ে সিআইডি অফিসে যান। তারা কাগজপত্র দেখে বলেন, কোনও অসুবিধা নেই। এরপর সন্ধ্যায় তাকে (শাহজাহান আলী) নিয়ে সিআইডি কর্মকর্তারা বাসায় আসেন এবং বাড়িতে তল্লাশি চালায়। তেমন কোনও কাগজপত্র না পেয়ে পলাশের কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক এবং একটি পেন ড্রাইভ নিয়ে যায় সিআইডি।
শাহজাহান বলেন, সিআইডি অফিসে পেন ড্রাইভ ও হার্ডডিস্ক আমার সামনে পরীক্ষা করতে বলি। যেন পরে কোনও কিছু না ঢুকাতে পারে। তারা আমার সামনেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এবং জঙ্গি তৎপরতার কোনও কিছু পায়নি। এরপর রাতে সিআইডি পুলিশ জানায়, তিনি (শাহজাহান আলী) বাসায় গিয়ে যেন ছেলের খাবার নিয়ে আসেন। ঢাকা থেকে আসা সিআইডির এক কর্মকর্তা নাকি রাতে পলাশের সঙ্গে কথা বলবেন। কথা বলা শেষ হলে পলাশকে ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন সিআইডি কর্মকর্তারা।
পলাশের বাবা বলেন, ‘পরেরদিন দুপুরের পর সিআইডি অফিসে গিয়ে শুনি, আমার ছেলেকে নিয়ে প্রেস-ব্রিফিং হচ্ছে। তাকে নাকি জিহাদি বইসহ বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে।’
পলাশের মা শাহানা বানু এবং স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, তাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। অথচ, এক কর্মকর্তা পলাশকে দেখে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ করলে তোর মুখে দাড়ি কেন? তুই জামাত করিস।’
তাদের প্রতিবেশী আলতাফ হোসেন, দোকানি হাফিজুর রহমান, আতিয়ার রহমান সবাই জানান, ছেলেটি খুবই ভদ্র ও মেধাবী। লেখাপড়া করার সময় দু’দফায় সে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
লেবুতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলিমুজ্জামান বলেন, ‘আমি শাহজাহান আলীকে কাগজপত্রসহ পলাশকে সিআইডি অফিসে নিয়ে যেতে বলি।’ চেয়ারম্যান বলেন, জিহাদি বইসহ পলাশকে আটকের ঘটনা তার জানামতে সঠিক না।
সিআইডি যশোর অঞ্চলের সহকারি পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘পলাশের বাবার কথা ঠিক না।’ এরপর ব্যস্ততার কথা বলে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, পলাশের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে কারও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে সিআইডি যশোর ও কুষ্টিয়া বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার শামসুল আলম তাদের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বলেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে যশোরের উপশহরে (সেক্টর-১, প্লট নম্বর-২০) সারথী মিল মোড়ের বাসা থেকে এসএম সাদিকুর রহমান পলাশ (২৯) নামে হিজবুত তাহরীর কেন্দ্রীয় এক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই সময় কম্পিউটার, পেনড্রাইভসহ কিছু বইপত্র জব্দ করা হয়।
/এআরএল/
আরও পড়ুন:








