মানবতাবিরোধী অপরাধে মীর কাসেম আলীর ফাঁসিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের স্বাক্ষী এবং তার নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম চূড়ান্তভাবে এক অসহনীয় কলঙ্ক থেকে মুক্ত হলো।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের স্বাক্ষী এবং একাত্তরে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তারা সবাই মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় ব্যাপক সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
৭১-এর একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন জসিম উদ্দিন। ডালিম হোটেলে নির্যাতনে মৃত্যু হয় তার। মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তার জ্ঞাতিবোন হাসিনা খাতুন বলেন, জাতি মীর কাসেমের সংঘটিত অপরাধের কলঙ্ক থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে।
হাসিনা খাতুন বলেন, ‘আমার আনন্দের সীমা নেই। এই ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
প্রসিকিউশনের একজন স্বাক্ষী জাহাঙ্গীর চৌধুরী। তিনি জয় বাংলা বাহিনীর উপপ্রধান ছিলেন। জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালে তার নৃশংসতার জন্য এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর বারবার ফাঁসি হওয়া উচিত।
শনিবার রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে কাশিমপুর কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২০ মিনিট তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ষষ্ঠ অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হলো।
এর আগে বিকাল চারটা ১৫ মিনিটে মীর কাসেমের সঙ্গে শেষ দেখা করতে কাশিমপুর কারাগারে যান তার পরিবারের ৪৭ সদস্য। তারা পাঁচটা ৫০ মিনিটে বেরিয়ে আসেন। এ সময়েই কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্বাহী আদেশ পাঠানো হয় বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন মিয়া।
কাশিমপুর কারাগার-২ সূত্র জানায়, শনিবার দুপুরের পর কারাগারের ভেতরে মঞ্চে চূড়ান্ত মহড়ায় চার জল্লাদ অংশ নেন। তারা হলেন শাহজাহান, দ্বীন ইসলাম, রিপন ও শাহীন।
এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাসেম ১৯৮৫ সাল থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ অর্থাৎ মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। তিনি হলেন জামায়াতের পঞ্চম শীর্ষ নেতা, চূড়ান্ত রায়েও যার সর্বোচ্চ সাজার সিদ্ধান্ত এসেছে।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট মীর কাসেমের আপিল রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে গেলে চূড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। এরপর রাষ্ট্রপতির কাছে তার প্রাণভিক্ষা চাওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে দু’দিন পর শুক্রবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালেই প্রাণভিক্ষা না চাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করেন তিনি। এরপরই ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষ। শনিবার সকাল থেকে কাশিমপুর কারাগার ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মীর কাসেমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর গত ৮ মার্চ আপিলের রায়ে ওই সাজাই বহাল থাকে। ৬ জুন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তা পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য ১৯ জুন আবেদন করেন মীর কাসেম।
রাষ্ট্রপক্ষ এরপর রিভিউ শুনানির দিন ধার্যের জন্য আবেদন করে। এর ধারাবাহিকতায় ২১ জুন চেম্বার বিচারপতি বিষয়টি নিয়মিত আপিল বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।
মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমেদসহ আটজনকে হত্যার দুটি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তখনকার আলবদর কমান্ডার মীর কাসেমকে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল।
/এমপি/







