টঙ্গীতে টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ পরিবারের লোকজন এখনও তাদের স্বজনদের সন্ধানে কারখানার আশপাশে অপেক্ষায় রয়েছেন। স্বজন খোঁজার অপেক্ষা যেন তাদের ফুরোয় না। এদিকে, উদ্ধার অভিযানে ধ্বংসস্তূপও যেন কমতে চায় না। এখনও সেখানে অভিযান চলছে।
অপেক্ষা ফুরাতে চায় না, ধ্বংসস্তূপও কমে না
টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার উপুলকি গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে জহিরুল ইসলাম(৩৭)। সে ছিল টাম্পাকো ফয়েলস অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের প্রিন্টিং শাখার সহকারী অপারেটর। তার ভগ্নিপতি আলাউদ্দিন নবম দিনেও জহিরুলের সন্ধানে টাম্পাকোর সামনে অপেক্ষা করছেন। ঘটনার পর থেকে রাস্তায়ই নাওয়া-খাওয়া সব চলছে।
আলাউদ্দিন বলেন,আমাদের ধারণা জহিরুলের মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচেই রয়েছে। জহিরুলের জন্য অপেক্ষা ফুরাতে চায় না। চোখের সামনে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন। যতই সরাচ্ছেন ততই মনে হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের আকার বাড়ছে।
এই বুঝি ইউনূস ভাইয়ের লাশটা পাওয়া যাচ্ছে
চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের ইউনূস আলী পাটোয়ারীর ছেলে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী ছিলেন টাম্পাকোর অপারেটর। তার শ্যালক তোফায়েল আহমেদ কাওসার বলেন, ৯ দিন হয়ে গেল আমরা ইউনূস আলীর জন্য কখনও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ আবার কখনও টাম্পাকো কারখানায় যাই। এখনও আছি টাম্পাকোতে।
তোফায়েল আরও বলেন, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের বড় বড় খণ্ড একের পর এক সরিয়ে দিচ্ছেন। ভেতর থেকে শুধু মানুষের লাশ পঁচে যাওয়ার দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কিন্তু কোনও লাশ পাওয়া যাচ্ছে না। কারখানার আশপাশেই থাকি, দুর্গন্ধ বাড়লে ধ্বংসস্তূপের কাছাকাছি ছুটে যাই। মনে হয় এই বুঝি ইউনূস ভাইয়ের লাশটা পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে বলে দিয়েছে, সোমবার থেকে ডিএনএ টেস্ট শুরু হবে। এজন্য টঙ্গী থানায় যোগাযোগ করে আমাদেরকে নিশ্চিত হতে বলেছেন।
ছেলের আত্মার শান্তির জন্য স্বজনদের খাওয়ার আয়োজন করছি
টাম্পাকো দুর্ঘটনার দু’দিন পর সোমবার ছেলে রাজেশ বাবুর (২২) লাশের সন্ধান পান মা মীনা রানী। ওইদিন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছেলের সৎকার করেন।
মীনা রানী বলেন, ধর্মের নিয়ম মতো মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্য সৎকারের সাতদিনের মাথায় আত্মীয়-স্বজনদের খাওয়াতে হয়। এজন্য খাওয়ার আয়োজন করছি, অন্তত ছেলের আত্মা যেন শান্তিতে থাকে।
উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী
আইএসপিআরের পরিচালক লে.কর্নেল রাশিদুল হাসান জানান, টাম্পাকো দুর্ঘটনার নবম দিনেও পুরোদমে উদ্ধার অভিযান চলছে। ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ অনেক বেশি। কতদিন অভিযান চলবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপ থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কিন্তু সে পর্যন্ত উদ্ধারকর্মীরা এখনও যেতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬১৬ টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। ঈদের পরদিন ভোর থেকেই সেনাবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা ভারী যানবাহন নিয়ে উদ্ধার কাজ পুরোদমে শুরু করেন। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং গাজীপুর জেলা প্রশাসনের কর্মীরাও রয়েছেন।
টাম্পাকোর ঘটনায় আরেকটি মামলা, আসামি ১০
এবার টাম্পাকো মালিকের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা হয়েছে। কারখানা মালিক মকবুল হোসেন লেচু মিয়াসহ এতে ১০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। শনিবার রাতে মামলাটি দায়ের করেন টঙ্গী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অজয় চক্রবর্তী।
টঙ্গী থানার ওসি (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম জানান, এ মামলায় মকবুল হোসেন ছাড়া অন্য অভিযুক্তরা হলেন- মকবুল হোসেনের স্ত্রী মোসা. পারভিন, মেয়ে হাবিবা, জামাতা সফিউদ্দিন, কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির আহমেদ, জেনারেল ম্যানেজার সফিকুর রহমান, ম্যানেজার (প্রশাসন) মনির হোসেন, ম্যানেজার (সার্বিক) সমির আহমেদ, ম্যানেজার হানিফ ও ডিএমডি আলমগীর হোসেন।
এদিকে, ১১ সেপ্টেম্বর রাতে নিহত শ্রমিক জুয়েলের বাবা আবদুল কাদের বাদী হয়ে টঙ্গী থানায় প্রথম মামলাটি দায়ের করেন।
ওই মামলায় কারখানা মালিক মকবুল হোসেনকে প্রধান আসামি করে ৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই মামলার অন্যান্য অভিযুক্তরা ছিলেন মকবুল হোসেনের স্ত্রী মোসা. পারভিন, কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির আহমেদ, জেনারেল ম্যানেজার সফিকুর রহমান, ম্যানেজার (প্রশাসন) মনির হোসেন, ম্যানেজার (সার্বিক) সমির আহমেদ, ম্যানেজার হানিফ ও ডিএমডি আলমগীর হোসেন।
উল্লেখ্য, ১০ সেপ্টেম্বর ভোর ছয়টা পাঁচ মিনিটের দিকে গাজীপুরের টঙ্গীর টাম্পাকো প্যাকেজিং কারখানার পাঁচতলা ভবনের নিচতলায় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কারখানায় আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২৯টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। সেখানে শ্রমিকেরা রাতের শিফটে কাজ করছিলেন। বিস্ফোরণের পর ভবনটি আংশিক ধসে পড়ে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।
/এআর/








