ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদার চার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অসময়ে যুবলো হাজার হাজার একর ফসল। চলতি বছর পিআইসি কমিটি গঠনে জটিলতার কারণে যথাসময়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। অন্যদিকে ঠিকাদাররা নিম্নমানের কাজ করায় পাহাড়ি ঢলে পানিতে একের পর এক বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে বোরো ফসল এমন অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের।
২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাধ নির্মাণের সম্পূর্ণ কাজ শেষ হয়নি। এ বছর জেলার ৪২টি হাওরের ফসল রক্ষায় ৫৮ কোটি টাকা ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদাররা আংশিক বাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে।
পিআইসির অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী, জামালগঞ্জ উত্তর ও তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ৯ হাজার হেক্টর বোরো জমির হালীর হাওর ডুবেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কালীবাড়ি বাঁধের চার পিআইসির সভাপতি হলেন- বেহেলী ইউপির ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য মনু মিয়া, ১নং ওয়ার্ডের সদস্য আবু সুফিয়ান, সংরক্ষিত ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রাশিদা আক্তার ও ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অজিত রায়।
রবিবার(২ এপ্রিল) রাতে হালীর হাওরের কালীবাড়ির বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে। এ সময় হালীর হাওরের বাঁধ রক্ষায় এলাকার কৃষকরা আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পিআইসির লোকজন এলাকা ছেড়ে চলে যায় বলে কৃষকদের অভিযোগ।
অভিযোগ উঠেছে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদার কালীবাড়ি বাঁধের পিআইসি সভাপতিদের তাগিদ না দিয়ে ও হাওরের বাঁধ নির্মাণের তদারকি ফেলে যুবলীগের কমিটি আনতে রাজধানী শহরে অবস্থান করছিলেন।
স্থানীয় ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, হালীর হাওরের কালীবাড়ি বাঁধ নির্মাণে প্রথমে দুটি পিআইসি গঠন করা হয়। একটির সভাপতি ইউপি সদস্য মনু মিয়া ও অন্যটির সভাপতি ইউপি সদস্য আবু সুফিয়ান। প্রথমে দুটি প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৮ লাখ টাকা। পরে এই বাঁধের বরাদ্দ আরও ২২ লাখ বৃদ্ধি করতে নতুন করে আরও দুটি পিআইসি গঠন করা হয়। একটির সভাপতি করা হয় ইউপি সদস্যা রাশিদা আক্তার ও অন্যটির সভাপতি অজিত কুমার রায়কে।
একাধিক কৃষকের অভিযোগ, প্রকল্প বরাদ্দ ২২ লাখ বৃদ্ধি করে ৪৬ লাখ টাকা করলেও সময়মত কাজ শুরু করা হয়নি। মার্চ মাসে বাঁধের কাজ শুরু করা হয়। শুরু থেকেই বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে পিআইসির সভাপতিদের বিরুদ্ধে। কাগজে কলমে ইউপি সদস্যরা চারটি পিআইসির সভাপতি থাকলেও বাস্তবে সবগুলো প্রকল্পে কাজ করেছেন বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদার। তিনি দায়সারাভাবে বাঁধের কাজ করেছেন। ইউপি সদস্যরা শুধু কাগজে কলমেই দায়িত্ব পালন করেছেন।
হালীর হাওর পাড়ের স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কালীবাড়ি বাঁধের কাজ সঠিক সময়ে শুরু হয়নি। প্রকল্পের নামে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বার ও এসও মিলে লুটপাট করেছে। যদি বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হতো তাহলে সহজে বাঁধ ভেঙে যেত না।
বেহেলী ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল হক মনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমাদের একমাত্র বোরো ফসলের হালীর হাওরের বাঁধ নিয়ে যখন চরম ঝুঁকি দেখা দেয় তখন চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার যুবলীগের কমিটি আনতে ঢাকায় হোটেলে বসে দিন কাটিয়েছেন। বাঁধের কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরাদ্দ লুটপাট হয়েছে। বাঁধ যখন ঝুঁকিতে পড়েছে তখন এলাকার ধনী-গরীব সকল কৃষক দিনরাত মাটি কেটেছে। কিন্তু সময়মত মাটি না দেওয়ার কারণেই দুর্বল বাঁধ অসময়ে ভেঙেছে।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউপির কালীপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কলমধর বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা এখনও সঠিকভাবে কাজ হয়নি। তাই দুর্বল বাঁধ সহজেই পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। কারণ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে হাওরের বাঁধ নির্মাণ করলে অবশ্যই এসব বাঁধ অনেক শক্ত ও মজবুত হতো, খুব সহজেই এভাবে ভেঙে যেতো না।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ওয়াপদা (পানি উন্নয়ন বোর্ড) এর সব কাজই হলো অনিয়ম আর দুর্নীতি। তাদের এমন কোনও কাজ নেই যেখানে দুর্নীতি হয় না। বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অকালে হাওরের ফসল ডুবির ঘটনা বার বার ঘটে। সারা এলাকাবাসীর দাবি সব অনিয়ম-দুর্নীতির গণতদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
এ ব্যাপারে বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
হালীর হাওরের কালীবাড়ি বাঁধের চার পিআইসির পক্ষে এক পিআইসি সভাপতি ইউপি সদস্য মনু মিয়া বলেন, ‘চেয়ারম্যান ও আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। কাজ বেশি, বরাদ্দ কম তাই আমরা দুই পিআইসির সভাপতি বাঁধের কাজ করতে রাজি ছিলাম না। পরে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও নতুন দুইটি পিআইসি দেওয়া হয়েছে। গত মার্চ মার্সের ১৪ তারিখ আমাদের সাইট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুরু থেকেই বরাদ্দ দিতে পাউবোর গড়িমসি ছিল। আমরা কাজ করেছি ৪০-৪৫ লাখ টাকার, আর পেয়েছি মাত্র ২৮ লাখ টাকা। বাকি টাকা এখনও পাইনি।’
মনু মিয়া আরও বলেন, ‘ইউপি সদস্য রাশিদা ও অজিত রায় কাজ করতে এবং পিআইসির সভাপতি হতে রাজি ছিলেন না। পরে চেয়ারম্যান সাহস দেওয়ায় ও নিজে কাজের দায়িত্ব নেওয়ায় তারা রাজি হন। কাজ চলার সময়ে চেয়ারম্যান নানাভাবে আমাদের টাকা ধারে এনে দিয়েছেন। পরে আমরা বিল তুলে চেয়ারম্যানের হাতে দিয়েছি। আমরা প্রকল্পের নিয়মের বাইরে ৬০ ফুটের স্থলে ১২০ ফুট প্রস্থ করে কাজ করেছি। আমাদের কাজে কোনও ধরনের গাফিলতি ছিল না।’
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফসার উদ্দিন বলেন, ‘গতবারের চেয়ে এবারে আগে থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। এছাড়া সীমান্তের ওপাড় থেকে প্রবল বেগে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে ও নদী খনন না করায় ফসল রক্ষা বাঁধের এ অবস্থা হয়েছে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এতে কারও হাত নেই। বাঁধ নির্মাণে কোনও অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি।
/এআর/








