চসিকের খাল খনন প্রকল্প: জলাবদ্ধতা নিরসন, নাকি অর্থের অপচয়?

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
১৪ মে ২০১৭, ০৮:০০আপডেট : ১৪ মে ২০১৭, ১১:৫৩

ভরাট হয়ে গেছে চট্টগ্রামের চাখতাই খাল, ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় তিনটি নতুন খাল খননের সুপারিশ করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। ২০১০ সালে নতুন একটি খাল খননের প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। ২০১৪ সালে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ইতোমধ্যে ওই প্রকল্পে অর্থ ছাড়ও শুরু হয়েছে। কিন্তু এখন নতুন এ খাল খননের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন খাল খনন লাগবে, নাকি বিদ্যমান ৩৯টি খালের সঠিক পরিচর্যায় নিরসন হবে জলাবদ্ধতা? নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ওয়াসার পরিকল্পনায় নতুন খাল খননের পরিবর্তে বিদ্যমান খালগুলোর পরিচর্যার কথা বলা হয়। এরপরই এই প্রশ্ন ঘুরাপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ড্রেনেজ ও স্যানিটেশন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ওয়াসার চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী করপোরেশন ‘ড্রেনেজ সিস্টেম’ ও ওয়াসা ‘স্যানিটেশন সিস্টেম’ এর কাজ করবে। ওই অনুষ্ঠানে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন জানান, ‘তিনটি নতুন খাল খননের প্রয়োজন আছে কিনা। আর যেটা বাস্তবায়নাধীন আছে, সেটির যৌক্তিকতা কতটুকু তা নির্ধারণ করতে হবে। আমরা চাই না, খাল খনন নিয়ে পরে নতুন কোনও বির্তক তৈরি হোক।’

একই অনুষ্ঠানে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মহাপরিকল্পনা নিয়ে এক বছরের মতো কাজ করছি। নগরীতে ৩৯টি খাল রয়েছে। আমরা যদি খালগুলোকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারি। তবে নতুন খাল খনন করার প্রয়োজন নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন এ ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় নতুন খাল খনন করতে হবে কিনা? অথবা যেগুলো আছে সেগুলো কী পরিমাণ প্রশস্ত করতে হবে, এ বিষয়গুলো যদি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তবে ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট তৈরি করতে আমাদের সহজ হতো।’

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নগরীতে ৩৯টি খাল আছে। এর মধ্যে ২২টি খাল কর্ণফুলী নদীতে, দুটি হালদা নদীতে এবং বাকি ১৫টি খাল সরাসরি সাগরে পতিত হয়েছে। এ খালগুলো থাকার পরও নতুন কোনও খাল খনন লাগবে কিনা তা নিয়ে দিধায় রয়েছে নগর পরিকল্পনাবিদরা।

অন্যদিকে ১৯৯৫ সালে করা সিডিএ ওই মহাপরিকল্পনার মেয়াদও শেষ। সিডিএ’র করা ওই মহাপরিকল্পনার মেয়াদ ছিল ২০ বছর। ২০১৫ সালে ওই মহাপরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হলেও দীর্ঘ এ সময়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। মেয়াদোর্ত্তীণ ওই মহাপরিকল্পনার আলোকে এখন খাল খনন করা ঠিক হবে কিনা সেটিও প্রশ্ন রাখেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। 


এ সর্ম্পকে নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন খাল খননের প্রয়োজন নেই ঠিক তা নয়। খাল খনন করতে হবে। খননের পর আবার দখল হয়ে গেলে তো কোনও কাজে আসবে না। পুরনো খালগুলোও দখলমুক্ত করা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিডিএ’র মহাপরিকল্পনা পাঁচ বছর অন্তর অন্তর নবায়ণ করার কথা থাকলেও গত বিশ বছরে একবারও নবায়ণ করা হয়নি। ওই মহাপরিকল্পনা নবায়ণ করা উচিত।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান অ্যাকোয়া কনসাল্টেন্ট অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডাব্লিওএম) এর সহায়তায় ডেনমার্কের স্বনামধন্য প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান গ্রন্টমি এ/এস এর তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ দুই বছর সমীক্ষা শেষে এ খসড়া ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। ওয়াসার খসড়া ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শহরের জলাবদ্ধতার জন্য খাল-নালার অপর্যাপ্ত প্রবাহ ক্ষমতা, আউটফল রিভার কর্ণফুলী ও হালদার জোয়ার-ভাটাসহ বিবিধ কারণকে দায়ী করা হয়। বিদ্যমান ও সম্ভাব্য এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরামর্শক দল নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল নালায় কঠিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ করণ, প্রতিবন্ধকতা ও অবৈধ অ্যানক্রোচমেন্ট উচ্ছেদ, ইউটিলিটি সার্ভিস লাইন পুনঃস্থাপন, নিয়মিত খাল-নালা পরিষ্কার করা, সরু ব্রিজ-কালভার্ট পুনঃনির্মাণ, টিটেনিং ওয়াল নির্মাণ, কাঁচা ড্রেন পাকা করণ, নতুন ড্রেন নির্মাণ, ক্রস ড্রেন নির্মাণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।  

এছাড়া নদীর পানির অনুপ্রবেশ রোধে খাল মুখে রেগুলেটর নির্মাণ, নদী পাড়ের রাস্তা উঁচু করা বা ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ, নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং নির্ধারিত খালের মুখে পাম্প স্থাপন করা পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের এই মহাপরিকল্পনায় জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন খাল খননের কোনও পরামর্শ দেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান এসএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সিডিএ যে মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিল, তা মোডিফাই করে ওয়াসা এ মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। কারণ, ওই সময়ের চট্টগ্রাম আর এখনকার চট্টগ্রাম এক নয়। সরকার অনুমোদন দিলে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।’

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের বিশেষজ্ঞ টিম স্টাডি করে দেখেছে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য নতুন খাল খননের প্রয়োজন নেই। যেখানে পুরনো খালগুলো দখল হয়ে আছে, সেখানে নতুন খাল করা অনর্থক। আরএস বিএস জরিপ ধরে দখল হওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধার করলেই জলাবদ্ধতা কেটে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দখল হওয়া খালগুলো উদ্ধার না করে নতুন খাল মানে অর্থের অপচয়। যদি কোনও খাল না থাকতো তাহলে না হয় খাল খনন প্রয়োজন ছিল। যেখানে ৩৯ টির মতো খাল বিদ্যামান আছে, সেখানে ফের জমি নষ্ট করার কী প্রয়োজন?’

ড্রেনেজ ও স্যানিটেশন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে বলে জানান ওয়াসা কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন হবে।

অন্যদিকে ২০১৪ সালে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর সময়মতো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ শুরুর আগেই নতুন এ খাল খনন প্রকল্পে দুই দফায় ৩২৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় বেড়েছে। সম্প্রতি ব্যয় সংশোধন করে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আবারও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠায় চসিক। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোরও আবেদন করা হয়। বর্তমান এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। গত ৪ মে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সংশোধিত ব্যয় যাচাই-বাছাইয়ের পর এ ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সম্প্রতি ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ মিলেছে। পাঁচটি এলএ কেসের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শিগগির শুরু করা হবে।

উল্লেখ্য, বাস্তবায়নের পর খালটির দৈর্ঘ্য হবে ২ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৬৫ ফুট। খালের উভয় পাড়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া খালের দুই পাশে নির্মিত হবে ২০ ফুট প্রশস্ত সড়ক।



/এসএনএইচ/ এপিএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭টি ওয়ার্ড
ডেঙ্গুর চরম ঝুঁকিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৭টি ওয়ার্ড
রামিসা হত্যা: সর্বোচ্চ সাজা চায় রাষ্ট্রপক্ষ, লঘুদণ্ডের দাবি আসামিপক্ষের
রামিসা হত্যা: সর্বোচ্চ সাজা চায় রাষ্ট্রপক্ষ, লঘুদণ্ডের দাবি আসামিপক্ষের
একা একা অনুশীলন করলেন মেসি
একা একা অনুশীলন করলেন মেসি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের