সেলফির জন্য ত্রাণ!

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
০৮ জুলাই ২০১৭, ১৪:৫১আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৭, ১৪:৫১

সরকারি-বেসরকারি কোনও ধরনের ত্রাণ না পাওয়ায় কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চলছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। সরকারিভাবে কিছু ত্রাণ সহায়তা এলেও তা অপ্রতুল। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ব্যবসায়ীসহ বেসরকারিভাবে যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, সেসবের মুখ্য উদ্দেশ্য ফটোসেশন ও সেলফি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ বন্যাদুর্গতদের। ফলে ত্রাণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে দুর্গত এলাকার অধিকাংশ মানুষ।

ত্রাণের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা বন্যাদুর্গতরা অভিযোগ উঠেছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা এবং ব্যবসায়ীরা বন্যাদুর্গত এলাকায় এসে ৫-১০ জন লোককে ত্রাণ দিয়ে ফটোসেশন করে ও সেলফি তুলেই কেটে পড়েন। পরে এসব ছবি বা সেলফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় কিছু পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালে প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদ আকারে।

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, সদর উপজেলা, রামু ও উখিয়ায় উপজেলায় বন্যার ভয়াবহতা একটু বেশি। এসব স্থানে পানিবন্দি ছিল অন্তত ১০ লাখ মানুষ। দুর্গতদের মধ্যে যারা সচ্ছল তারা ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও বেশি বেকায়দায় পড়ে অসহায়, অস্বচ্ছল ও ছিন্নমূল মানুষ। এসব অসহায় মানুষের মধ্যে কেউ কেউ ত্রাণ পেলেও বঞ্চিত রয়েছেন অধিকাংশ মানুষ।

উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের উত্তর সোনাইছড়ি গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি হাবিব উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি কখনও ত্রাণ পাইনি। তবে আমার ভাইপো জাফর আলমকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া উচিত ছিল সরকারের। কারণ সে একজন দিনমজুর। বিশেষ করে বন্যায় বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি বানের পানিতে ভেসে মারা যায় তার মেয়ে ছমিরা আকতার। বলতে গেলে সে এখন নিঃস্ব। কিন্তু এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনও ধরনের ত্রাণ পায়নি জাফর। তবে একজন স্থানীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী কিছু অর্থ দান করে কয়েকটি ছবি তুলে চলে গেছে।’

কক্সবাজারে ত্রাণ বিতরণের এই দৃশ্য দেখা যায় স্বল্প সময় এখনও সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে একমুঠো ত্রাণ সহায়তাও না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিরের বয়োবৃদ্ধা ছফুরা খাতুন। তিনি জানান, বন্যার পানি তার বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তার ঠিকানা এখন খোলা আকাশের নিচে। কিন্তু বন্যার পানি চলে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানিসহ নানান সমস্যা রয়েছে। আছে অর্থকষ্ট।

রামু উপজেলার ফতেখারকুল ইউনিয়নের চালইন্ন্যাপাড়া কামাল হোসেনের দুই সন্তান শাহিন (১০) ও ফাহিমের (৮) মৃত্যু হয় পানিতে ডুবে। একসঙ্গে দুই ছেলেকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া তাদের বাবা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার সন্তানদের মৃত্যুর পরদিন একজন রাজনৈতিক নেতা এসে তাকে কিছু অর্থ সহায়তা দিয়ে তুলে নিয়েছেন কয়েকটি সেলফি ও ছবি। কিন্তু সরকারিভাবে এ পর্যন্ত কোনও ত্রাণ পাননি তিনি। একইভাবে ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন চাকমারকুল, জোয়ারিয়ানালা ও রশিদ নগর এলাকার অধিকাংশ দুর্গত মানুষ।

কক্সবাজারে ত্রাণ বিতরণের এই দৃশ্য দেখা যায় স্বল্প সময় কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সাংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল এক প্রেস বার্তায় বলেছেন, ‘খালি হাতে ত্রাণ দিয়ে সেলফি বা ছবি ওঠাবেন না।’

চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাফর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চকরিয়ায় লাখো মানুষ যখন ক্ষতিগ্রস্ত, তখন একশ্রেণির সুবিধাবাদীরা বন্যার অথৈ পানিতে ভাসমান মানুষদের নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছে। তারা ত্রাণের নামে ফটোসেশন ও সেলফি তুলছে। দুয়েকটি পরিবারকে ত্রাণ দিয়ে ছবি তোলার পরই দ্রুত এলাকা ত্যাগ করছে। পরে টাকা খরচ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব ছবি ছাপিয়ে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা চলছে। এটি বন্যাদুর্গত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা ছাড়া আর কিছু না।’

দ্রুত বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণের আহ্বান জানিয়ে রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বন্যায় সেতু, কালভার্ট ও রাস্তা সব লণ্ডভণ্ড হওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি ত্রাণসামগ্রী এখনও অপ্রতুল। উপজেলা পরিষদের সামান্য যে বরাদ্দ আছে, সেগুলো আপাতত বানভাসি মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।’

পর্যায়ক্রমে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে না, খবরটি সঠিক নয়। ইতোমধ্যে দুর্গত এলাকায় নগদ ৩ লাখ টাকা, ৩৩ মেট্রিক টন চাল ও ডালসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বন্যাদুর্গত মানুষদের কাছে ত্রাণ বিতরণের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’

এদিকে বেশ ক’দিন ধরে ত্রাণ দিতে গিয়ে ছবি বা সেলফি তোলার বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় উঠছে। অনেকে লিখেছেন, ‘উখিয়ায় ত্রাণ বিতরণের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, আছে ফটোসেশনে অংশ নেওয়া ভিলেন, আছে সমালোচক’, ‘পাঁচ টাকার মুড়ি, দুই টাকার গুড় নিয়ে ত্রাণ প্রতারণা। এখন দেখছি ত্রাণের জন্য ফটোসেশনের শুটিং চলছে।’

উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতেই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ। এতে পাহাড় ধসে ও পানিতে ডুবে মারা যান শিশুসহ ৭ জন। গত সপ্তাহে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩০টির অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে যায় পানির নিচে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে বানভাসি মানুষ। অনেকে ঘরবাড়ি, গৃহপালিত পশু, ধান, চালসহ বিভিন্ন সহায় সম্পত্তি হারিয়ে এখন নিঃস্ব। এসব এলাকার সেতু, কালভার্ট ও গ্রামীণ সড়ক বিধ্বস্ত হওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

/জেএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম