প্রায় দুইশ বছর পর সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের সোমেশ্বরী (পিচগাঙ) নদীতে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর। ফলে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দাসহ আশপাশের এলাকার সাত লাখেরও বেশি মানুষের দুর্ভোগ শেষ হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে। ৫০ মিটারের মতো দীর্ঘ বাঁশের সেতু পার হতে গিয়ে প্রায়ই যে ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে সেগুলোর হাত থেকে মুক্তি মিলবে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।
ধর্মপাশা উপজেলার উত্তরের অবহেলিত জনপদ মধ্যনগর থানার চামরদানী ইউনিয়ন ও মধ্যনগর ইউনিয়নের সীমান্তে ভারতের সীমান্ত এলাকাসহ টেকেরঘাট-বাদাঘাট থেকে ধর্মপাশা, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা হয়ে ঢাকা যাওয়া-আসার একমাত্র সড়কের মধ্যে পড়েছে সোমেশ্বরী নদী। আর এই নদী পার হওয়ার একমাত্র উপায় কায়েতকান্দা এলাকায় স্থাপিত বাঁশের চাটাইয়ের সেতু। এই সেতু দিয়েই প্রতিদিনই শত শত যাত্রীবাহী মোটরসাইকেলসহ বিপুল মানুষ আসা-যাওয়া করেন। দীর্ঘ বাঁশের সেতু পার হতে গিয়ে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসী জানান, ধর্মপাশা-মধ্যনগর সড়কের বেশ কয়েকটি অংশে ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও গত দুইশ বছরের মধ্যে সুমেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণের কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেয়নি সরকার। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, ‘এ মাসের মধ্যেই সোমেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং দুই-এক মাসের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এতে হাওর এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে।’
ধর্মপাশা উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, মধ্যনগর বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কায়েতকান্দা গ্রামের কাছে ২২০ মিটার দীর্ঘ ও ৭ দশমিক তিন মিটার প্রস্থের পিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘আমাদের অফিসে সেতুর চূড়ান্ত ডিজাইনের কপি এসে পৌঁছেনি। তবে নদীর দুই পারের দূরত্ব নির্ণয় করে করে ঢাকা অফিসে পাঠানো হয়েছে।’
বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণউড়া গ্রামের বিপ্লব বিশ্বাস বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর হলেও সরকার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমরা খুশি। এলাকাবাসী দ্রুত সেতুর নির্মাণ কাজের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।’
মীর্জাপুর গ্রামের মতি মিয়া বলেন, ‘বর্ষাকালে নৌকা দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে পারলেও হেমন্ত মৌসুমে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভোগের স্বীকার হয়। সেতু হলে মানুষের কষ্টের অবসান হবে।’ হামিদপুর গ্রামের লতি মিয়া বলেন, ‘সোমেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণ হলে এলাকার কৃষকরা খুব উপকৃত হবে। উত্তর ও দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে সরিষার আবাদ করা হয়। কৃষকরা ঘোড়ার গাড়িতে ও নৌকা দিয়ে সরিষা মধ্যনগর মোকামে নিয়ে যায়। এতে যোগাযোগ খরচ ও কষ্ট কয়েক গুণ বাড়ে।’
দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাসেল আহমদ বলেন, ‘মধ্যনগর বাজার হলো ভাটি বাংলার বৃহত্তম ধান, চাল ও সরিষা বিক্রির মোকাম। প্রত্যেক মৌসুমে কোটি কোটি টাকার ধান চাল ও সরিষা বিক্রি হয়। সোমেশ্বরীতে সেতু না থাকায় এলাকাবাসী সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।’
বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান মো. আজিম মামুদ জানান, বংশীকুণ্ডা থেকে ধর্মপাশা উপজেলা সদরের দূরত্ব মাত্র ২৭ কিলোমিটার। কিন্তু ২৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। সেতুর অভাবে মোটর সাইকেল ও বাইসাইকেল ছাড়া অন্য কোনও যানবাহন চলাচল করে না। এতে এলাকার কৃষক ধান চাল পরিবহনে বিড়ম্বনার শিকার হন।
মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, ‘ধর্মপাশা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এই পিচগাঙ সেতু। ব্রিটিশ আমল থেকে এসব এলাকার মানুষ শুষ্ক মৌসুমে জীবনের ঝুঁকি নদী পারাপার হয়ে আসছে। সাত লাখ মানুষের সড়ক যোগাযোগের পথ সুগম করতে দ্রুত সেতুটি নির্মাণ করা প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন- অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ৩০০ বাড়ি যমুনায় বিলীন








