শত কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’, মনে ছিল উৎকণ্ঠাও

মেহেদী হাসান, চুয়াডাঙ্গা
১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৭:৫৮আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৮:০০

আট শহীদের কবর (ছবি- প্রতিনিধি)

১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে চুয়াডাঙ্গার নিরীহ মানুষের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও অমানবিক নির্যাতন শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী। তবে এই হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে বেশিদিন সময় নেননি এই জেলার মুক্তিকামী মানুষ। তাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ৪ ডিসেম্বর থেকে শত্রুমুক্ত হতে থাকে এখানকার বিভিন্ন এলাকা। আর ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনেক সদস্যের নিহত হওয়া ও বেশিরভাগের পালিয়ে যাওয়া এবং রাজাকার-আলবদরদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পুরো জেলা শত্রুমুক্ত হয়।
শত্রুমুক্ত ঘোষণার পর রাস্তায় নেমে আসে জনতা। মুক্তির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। শত শত মানুষ কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গগনবিদারী আওয়াজ তোলে— ‘জয় বাংলা’।
মুক্তিযুদ্ধকালীন চুয়াডাঙ্গার অবস্থা ও বিজয়ের গল্প বলতে গিয়ে এসব কথা জানান জেলার মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা। তাদের ভাষ্য, সবখানে মুক্তির আনন্দ ছড়িয়ে গেলেও একধরনের উৎকণ্ঠাও ছিল, ছিল ভীতিও। কারণ নিজের এলাকা শত্রুমুক্ত হলেও তখনও স্বাধীন হয়নি প্রিয় দেশ।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ বাজারে প্রথম সশস্ত্র হামলা চালায় পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীর ২৯ নং বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা। ওই দিনের হামলায় প্রাণ হারান সরোজগঞ্জ বাজারে থাকা দুই শতাধিকের বেশি মানুষ। এরপর থেকে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি গাড়তে থাকে পাকিস্তানি সেনারা। ৭ ডিসেম্বরের আগে তারা এসব ঘাঁটি থেকে অভিযান চালিয়ে এবং এসব ঘাঁটিতে ধরে এনে চুয়াডাঙ্গার ১০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে। হাজারও মানুষকে নির্যাতন, শত শত নারীকে ধর্ষণ তো ছিলই।
জেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু হোসেন জানান, চুয়াডাঙ্গা ৮নং সেক্টরের অধীনে ছিল। এ সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মোস্তাফিজুর রহমান, মেজর আবু ওসমান, ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী ও ক্যাম্পেন তৌফিকি এলাহি। এ জেলায় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এর মধ্যে ৫ আগস্ট দামুড়হুদার নতিপোতার আটকবর, ২১ সেপ্টেম্বর মুজিবনগরের সোনাপুর, ৭ অক্টোবর জীবননগরের রাজাপুর, ৭ নভেম্বর তালতলার সম্মুখযুদ্ধ উল্লেখযোগ্য।
৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ৫ আগস্ট গেরিলা গ্রুপ কমান্ডার হাফিজুর রহমান জোয়ার্দ্দারের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্ত সংলগ্ন একটি গ্রামের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেন। এসময় কৃষকদের মাঠের পাকা ধান রাজাকাররা কেটে নিয়ে যাচ্ছে বলে খবর পান মুক্তিযোদ্ধারা। এ খবর শুনে তারা ঘটনাস্থলের দিকে ছুটতে থাকেন। পথে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা করলে সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে গোকুলখানি গ্রামের ইয়াকুব হোসেনের ছেলে হাসান জামান, কুষ্টিয়া পোড়দহের মহিউদ্দীনের ছেলে খালেক সাইফ উদ্দীন তারেক, আলমডাঙ্গা বটিয়াপাড়া গ্রামে রহমানের ছেলে রওশন আলম, চুয়াডাঙ্গা মহিউদ্দীন আহম্মেদের ছেলে আলাওল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা শহরের বজলু রহমানের ছেলে আবুল কাশেম, মমিনপুরের সিদ্দিক আহম্মেদের ছেলে রবিউল ইসলাম, আলমডাঙ্গা রুয়াপোল গ্রামের রহিম মন্ডলের ছেলে কিয়ামউদ্দীন ও চন্দ্রবাস গ্রামের রমজান আলীর ছেলে আফাজ উদ্দীন শহীদ হন।
আবু হোসেন আরও জানান, জেলায় প্রায় ১৮০০ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে ১৫০০ জনের বেশি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। এখনও বেঁচে আছেন ১০০৬ জন। এর মধ্যে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আছেন ১৩৭ জন। এছাড়া এ জেলায় দু’জন বীরপ্রতিক রয়েছেন। তারা হলেন, সাইদুর রহমান এবং হারুন অর রশীদ। হারুন অর রশীদ মারা গেছেন, তবে এখনও সাইদুর রহমান বেঁচে আছেন।
দামুড়হুদা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার আছির উদ্দিন জানান, হেমায়েতপুর গ্রামেও পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ হয়েছিল। এতে ৩ পাকিস্তানি হানাদার মারা যায়।
৮নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লিয়াকত আলী ও সাবেক জেলা ইউনিট কমান্ডার খন্দকার তানজির আহম্মেদ জানান, ডিসেম্বর মাসের প্রথম থেকেই চুয়াডাঙ্গা মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। ৪ ডিসেম্বর জীবননগর ও দর্শনায় মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকার করে পাকিস্তানি সেনারা চুয়াডাঙ্গায় শক্ত ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা ৬ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার আশপাশে জড়ো হতে থাকেন। দিনভর চরম উত্তেজনা চলে। পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর উপর্যুপরি আক্রমণ চালানো হয়। আক্রমণের মুখে ওই দিন রাতেই তারা চুয়াডাঙ্গা ছেড়ে কুষ্টিয়ার দিকে চলে যায়। যাওয়ার আগে শহরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করে এবং মাথাভাঙ্গা সেতুর পূর্ব প্রান্ত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। ৭ ডিসেম্বর ভোর চারটার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা বীরের বেশে চুয়াডাঙ্গায় প্রবেশ করেন।

/এমএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম