দেখতে দেখতে বছরঘুরে আরেকটি বর্ষা সমাগত। কিন্তু এখনও মাথার গোঁজার ঠাঁই হয়নি আগুনে বসত পুড়িয়ে দেওয়া লংগদুর দুই শতাধিক পরিবারের। গত বর্ষা তাদের কেটেছে টংঘরে, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ অমানুষিক কষ্ট করেছেন। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। আবার শুরু হচ্ছে বর্ষা মৌসুম। এবারও তাদের দিন পার করতে হবে টংঘরেই!
গতবছরের ২ জুন রাঙামাটির লংগদু উপজেলার তিনটি পাহাড়ি গ্রামের অসংখ্য বাড়িঘরে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে গত বর্ষায় এসব গৃহহীন পরিবার আত্মীয় স্বজনের বাড়ি, বিহার ও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাতে বাধ্য হন।
বর্ষার পর কেউ নিজ ভিটায় পোড়া টিন দিয়ে টং ঘর বানিয়ে থাকতে শুরু করেছেন; কেউ এখনও আত্মীয়ের বাড়িতে অথবা ভাড়া বাসা নিয়ে থাকছেন।
এবার আবারও বর্ষা উপস্থিত। কিন্তু ঠিক হয়নি ঘর। গত ৩০ মে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ১৭৬টি ঘর নির্মাণের কাজ। ১২০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। অর্থাৎ, এ বর্ষাতেও দুর্ভোগ সঙ্গী হবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর।
এ নিয়ে হতাশা কাজ করছে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে। তিনটিলা গ্রামের প্রেমরঞ্জন বলেন, ‘জানি না কী অপরাধে আমাদের বাড়িগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আমি আমার ঘরটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ঘটনার কয়েক মাস আগে বানিয়েছিলাম। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে সব হারিয়ে ফেলেছি। এখন ভাড়া বাসায় থাকছি। একবছর হতে চললেও এখনও নিজেদের বাড়িতে উঠতে পারলাম না।’
মানিকজোড় ছড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত দিগন্ত চাকমা বলেন, ‘এখনও টংঘরে আছি, কই যাবো? এখানে বৃষ্টিতে ভিজি, আবার রোদে শুকাই। যাওয়ার আর কোনও জায়গা নেই আমাদের। ঘরের কাজ শুরু হয়েছে; যেদিন ঘর হবে, সেদিন গিয়ে উঠবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিজে ঘর বানানোর মতো টাকা হাতে নেই। যা ইনকাম, তা দিয়ে সংসারও চলে না।’
অগ্নিসংযোগের প্রায় এক বছর পর ৩০ মে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে সরকার ১৭৬ টি ঘর তৈরির কাজ শুরু করেছে। এ জন্য সরকার ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ৬টি প্যাকেজের মধ্যে ক্যাবল নেটওয়ার্ক ২টি প্যাকেজে ৬০টি, সাইফুল এন্টারপ্রাইজ একটি প্যাকেজে ৩০টি, মিতা ত্রিপুরা দুটি প্যাকেজে ৬০টি, মাহারুম টেডার্স একটি প্যাকেজে ২৬টি, মোট ১৭৬টি ঘর নির্মাণের জন্য ১২০ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ক্যাবল নেটওয়ার্ক তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে।
পশ্চিম বাইট্টাপাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত মানিক্যা চাকমা বলেন, ‘গত বর্ষার ঘরটি পুড়ে গেলো। এখনও ঘর পাইনি। এই বর্ষাও ঘরছাড়া থাকতে হবে। সরকার নাকি ঘরের কাজ শুরু করেছে। শোনে ভালো লাগলো। দেরিতে হলেও কাজটি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে ভিজে সব শেষ হয়ে যাবে। বৃষ্টি হলে সবাই এক জায়গায় উঠে বসে থাকি। কিছু করার নেই।’
গতবছরের ১ জুন লংগদু সদর ইউনিয়নের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়ন যাত্রী নিয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পর বিকালে খাগড়াছড়ির চার মাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। পরদিন ২ জুন তার লাশ নিয়ে জানাজার জন্য মিছিল নিয়ে বাইট্টাপাড়া থেকে লংগদু উপজেলা পরিষদ মাঠে রওনা দেন তার সমর্থকরা। পথে তিনটিলা পাড়ায় মিছিল থেকে হঠাৎ করে পাহাড়িদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে ৩ গ্রামের ২১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।








