মধু মাসে মধু মন, জমে ওঠে মধু ক্ষণ... হ্যা, ঠিক তাই ঘটছে বরেন্দ্রভূমি-খ্যাত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। পাকা আমের মিষ্টি গন্ধে ভরে উঠতে শুরু করেছে আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই জেলার আম-বাজারগুলো। বাতাসে ছড়াচ্ছে আম পাকার মিষ্টি গন্ধ। গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাতসহ বিভিন্ন জাতের গুটি আমের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। দাম নাগালের মধ্যে থাকায় খুশি ক্রেতারাও। তবে সব জাতের আম উঠলে বেচাকেনা আরও জমবে বলে আশা বিক্রেতাদের। এদিকে কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাসায়নিক মিশিয়ে আম বাজারজাত রোধে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।
দেখা যায়, ভোর হতেই দলে দলে আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা ছুটছেন আমবাগানে। চলছে মগডাল থেকে আম পাড়ার ধুম। গ্রীষ্মের এমন প্রখর তাপও দমাতে পারেনি মানুষকে।
ইতোমধ্যেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন জাতের গুটি, গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাতসহ বিভিন্ন জাতের আম। প্রশাসনের বেধে দেওয়া সময় অনুযায়ী গত ২৫ মে থেকে জেলার ভোলাহাট, কানসাট, সদরঘাট, রহনপুর বাজারের মোকামগুলোতে বেড়েছে এ মধুফলের চাহিদা। তবে চাহিদা বাড়লেও চলতি মৌসুমে এখনও আশানুরূপ বেচাকেনা শুরু হয়নি বলে জানান বিক্রেতারা।
এ প্রসঙ্গে সদরঘাট আম বাজারের ব্যবসায়ী বরজাহান আলী জানান, ‘চলতি আম মৌসুমে প্রায় দুই সপ্তাহ দেরিতে গাছে আমের মুকুল আসায়, আম পরিপক্ক হতে এবার সময় বেশি লেগেছে। সেইসঙ্গে এবার আবহাওয়া ঠান্ডা ও বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় আম পাকতেও সময় লেগেছে বেশি। যে কারণে ২৫ মে থেকে আম পাড়া ও বাজারজাতের সময় ঠিক করে দেওয়া হলেও, বাজারে আমের সরবরাহ কম এবং আশানুরূপ বেচা-বিক্রি হচ্ছে না।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ নতুনহাট এলাকার আমচাষি মুসা জানান, ঝড় ও শিলাবৃষ্টির পরও এবার বাগানে আম ভালো আছে। তবে আশানুরূপ বেচা-বিক্রি না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে মানুষ ঈদের কেনাকাটা নিয়ে অনেকটা ব্যস্ত। এছাড়া রমজান মাসে মানুষ আম কিছুটা কম খাওয়ার কারণে বাজারে আমের সরবরাহ কিছুটা কম।’
আরেকজন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, এখন সদরঘাট আম বাজারসহ জেলার অন্যান্য বাজারগুলোতে ঢাকা, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বাইরের পার্টি কম আসায় আম বিক্রি হচ্ছে কম। ঈদের পর ছাড়া বাজার তেমনভাবে জমে উঠবে না বলেই মনে হচ্ছে। ঈদের পরে ল্যাংড়া, লক্ষণভোগসহ আরও বিভিন্ন জাতের আম উঠলে বাজার জমে উঠবে আশা করছি।
ব্যবসায়ীরা জানান, ‘বর্তমানে আমের জাতের মধ্যে ক্ষিরসাপাত প্রতিমণ কাঁচা আম ১৪শ’ থেকে ১৬শ’ টাকায়, গোপালভোগ ১৭শ’ থেকে দুই হাজার ও বিভিন্ন জাতের গুটি আম যার বেশিরভাগই জুস তৈরিতে ব্যবহৃত হবে যা ৩৫০ টাকা থেকে ৫শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পাকা গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত আম খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা কেজি। অন্যদিকে গুটি জাতের অন্যান্য আমের মধ্যে বৃন্দাবনি, মিছরিকান্তসহ অন্যান্য আম বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে। আর এসব আম শেষ হলে বাজারে আসবে ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি এবং আশ্বিনা আম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবছর যে পরিমাণ আম উৎপাদিত হয়েছে, তাতে ঈদের পর আরও মাস দুয়েক আমের বাজার জমজমাট থাকবে।
সদরঘাট আম আড়তদার বহুমুখী সমবায় সমিতিরি সাধারণ সম্পাদক আসলাম জানান, ‘গতবারের চেয়ে এবার আমের দামও কম, আবার বিক্রিও কম। গতবার যেখানে এসময় আমরা প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার আম বেচা-কেনা করেছি; সেখানে এবার এখন পর্যন্ত আমরা গড়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার আম বেচা-কেনা করছি।’
বাজার জমে না উঠার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এখন চলছে রমজান মাস। এই মাসে মানুষের ঈদের কেনাকাটার একটা বাড়তি খরচ আছে। সেই সাথে বাইরের ব্যাপারীরা এখনও বাজারে তেমনভাবে আসেনি। তবে আমরা আশা করছি ঈদের পরই জমে উঠবে আমের বাজার। তখন আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা আমের দামও ভালো পাবে।’
একই চিত্র জেলার সবচেয়ে বড় আমবাজার কানসাট আম বাজারেও। আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক জানান, এই মুহূর্তে কানসাট আম বাজারে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে। অথচ এই সময় কানসাটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়ে থাকে। তিনি আরও বলেন, ‘এখন বেশিরভাগ আমই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অফিসের কলিগ ও বসদের জন্য কুরিয়ারের মাধ্যমে জেলার বাইরে পাঠানো হচ্ছে এবং ক্রেতাদের একটি বড় অংশই স্থানীয়।’
তবে এবার এখন পর্যন্ত আমের দাম নাগালের মধ্যে থাকায় খুশি ক্রেতারা। আর আমের দাম কম থাকায় জেলার বাইরে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, বিভিন্ন অফিস-আদালতে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে আম পাঠানোর হিড়িকও শুরু হয়েছে। কিছু বাইরের ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা ছাড়া এখন পর্যন্ত যে আমের বেচা-কেনা হচ্ছে তার বেশিরভাগই স্থানীয় ভোক্তা ও পরিচিতজনদের পাঠানোর উদ্দেশ্যে। পাশাপাশি চাঙ্গা হয়ে উঠতে শুরু করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় কুরিয়ারগুলোতে আম পাঠানোর ব্যবসা। শুধু তাই নয় বাজার ও বাগান থেকে দ্রুত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুস্বাদু আম পৌঁছে দিতে পরিবহন (ট্রাকে করে) ব্যবসায়ও প্রাণ ফিরে আসতে শুরু করেছে।
আমে রাসায়নিক মেশানোর ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মঞ্জুরুল হুদা জানান, পুরো আম মৌসুমে কেউ যাতে কোনও ধরনের রাসায়নিক মিশিয়ে আম বাজারজাত করতে না পারে, সে বিষয়ে আম বাগান ও আম বাজারগুলো কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।
জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই বছর ২৯ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হয়েছে। যার সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে আড়াই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি। গত বছর আমের উৎপাদন হয়েছিলো ২ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন।








