পুলিশি টহলেও থমথমে বোরহানউদ্দিন

Send
ভোলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২১:২৮, অক্টোবর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫৭, অক্টোবর ২২, ২০১৯

পুলিশের টহলভোলার বোরহানউদ্দিনে গত রবিবার (২০ অক্টোবর) জনতা-পুলিশ সংঘর্ষে চার জন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার পর এলাকায় এখনও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কথিত একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এত বড় ঘটনার পর আতঙ্কে থাকার কথা জানিয়েছেন এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা। তবে ভবিষ্যতে যাতে এরকম ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন।

মঙ্গলবার বোরহানউদ্দিনে গিয়ে দেখা গেছে, কিছুটা চাপা উত্তেজনা থাকলেও জনজীবন স্বাভাবিক। দোকানে দোকানে, বাজারে, বাস টার্মিনালে রবিবারের ঘটনা নিয়ে অল্প-বিস্তর আলোচনা হলেও বড় ধরনের কোনও উদ্বেগ নেই। ভোলায় সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) অনুষ্ঠিতব্য পূর্ব ঘোষিত বিক্ষোভ হয়নি। ভোলার হাটখোলা মসজিদ থেকে বিকালে এ বিক্ষোভ হওয়ার কথা ছিল। সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের নেতা মাওলানা মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, পুলিশ বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের নেতাকর্মীদের শহরে আসতে দেয়নি। এছাড়া সবকিছু বিবেচনা করে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। এদিকে ভোলা ও বোরহানউদ্দিনে রবিবার থেকেই বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের টহল দেখা গেছে।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম বলেন, ‘বোরহানউদ্দিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সবাই মর্মাহত। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলি আযম মুকুল ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারকে  সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছি। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি এখন শান্ত এবং স্বাভাবিক রয়েছে।’

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক অবিনাষ নন্দী বলেন, ‘আমরা নাসিরনগরের ঘটনা দেখেছি। ‘৯২ সালে ভোলায় হিন্দুদের ওপর নির্যাতন দেখেছি। বোরহানউদ্দিনের ঘটনার পর আমরা অবশ্যই আতঙ্কিত। প্রশাসন আশ্বস্ত করলেও আমাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। রবিবার বোরহানউদ্দিনে জনতা-পুলিশ সংঘর্ষে চার জন নিহত হয়েছেন, এ জন্য আমরাও শোকাহত। মানুষের প্রাণ তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু সেদিন বোরহানউদ্দিনের ভাওয়াল বাড়িতে হামলা হয়েছে, আমরা কিছুই করতে পারিনি। এরকম যে আর ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কী?’

পুলিশের টহরতিনি আরও বলেন, ‘বোরহানউদ্দিনের ঘটনা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। আগে থেকে পরিকল্পনা করে এটা ঘটানো হয়েছে বলে সন্দেহ করি। আমরা সব ধর্মের মানুষের সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী। কোনও ধর্মকে কটূক্তি বা কোনও ধর্মীয় নেতাকে কটূক্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তদন্তে যারা দোষী প্রমাণিত হবে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি।’

ভোলা জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ দুলাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘আমরা যারা জেলা শহরে বাস করি তারা অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে হলেও টিকে আছি। জেলা শহরে হিন্দু সম্প্রদায়ের যারা আছেন তাদের সমস্যা নেই। তবে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আমাদের লোকজন ফোন করে জানাচ্ছেন তারা আতঙ্কে আছেন।’

তিনি বলেন, ‘বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য শুভর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে। এ ঘটনায় আটক একজন তার কাছে টাকা চেয়েছে তার প্রমাণও আছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য ফেসবুক ব্যবহার করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। শুভ নিজে করে থাকলে সে থানায় যেতো না। যেখানে ভোলার এসপি’র ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয় সেখানে শুভরটা হতেই পারে। তারপরও এ ঘটনা তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার দাবি করি।’

সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদ সোমবার সকাল ১১টায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকলে প্রশাসন সকাল থেকে ভোলার সব অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। ভোলা বাস মালিক সমিতিরি সেক্রেটারি আবুল কালাম জানান, ‘প্রশাসনের অনুরোধে সোমবার সকাল থেকে জেলার অভ্যন্তরীণ সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখি। পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়ায় সোমবার বিকাল সাড়ে ৫টার পর বাস চলাচল শুরু হয়।’

সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদ, ভোলার অন্যতম নেতা মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রশাসনের অনুরোধে এবং সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আমরা গতকাল ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ করিনি। আজকের বিক্ষোভও স্থগিত করেছি। আমরা আশা করি প্রশাসন আমাদের দাবি মেনে নেবে। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুন্দর ও স্বাভাবিক রাখতে আমরাও আন্তরিক।’

ভোলার তালুকদার ভবন মার্কেটের সেক্রেটারি মো. হারুন জানান, ‘শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় আমরা গতকাল দুপুর থেকেই মার্কেটে বেচাকেনা করছি।’ সদর রোডের ব্যবসায়ী জগদিশ বনিক, সুলতান আহমেদসহ অন্য ব্যবসায়ীরাও একই মন্তব্য করেন।

এদিকে নিহত চার জনের মধ্যে রবিবার একজনের ও সোমবার তিন জনের লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পুলিশের টহরজেলার সব মন্দির ও হিন্দুপ্রধান এলাকায় পুলিশের নজরদারি রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার সরকার মো. কায়সার। তিনি বলেন, ‘ভোলা ও বোরহানউদ্দিনে র‌্যাব ও বিজিবির টহল অব্যাহত রয়েছে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।’

অন্যদিকে বোরহানউদ্দিনের ঘটনায় জেলা প্রশাসক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান স্থানীয় সরকার বিভাগ, ভোলার উপ-পরিচালক মামুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য নিয়েছি। বুধবার কমিটির রিপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব নাও হতে পারে। আমরা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে সময় বাড়িয়ে নেবো।’

উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর নিজের ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার অভিযোগে ভোলার বোরহানউদ্দিন থানায় জিডি করেন বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য (২৫) ওরফে শুভ। তার অ্যাকাউন্টের ম্যাসেঞ্জার থেকে ‘মহানবীকে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য’ ছড়িয়ে সেই ‘স্ক্রিনশট’ ব্যবহার করে গত শুক্রবার থেকে বোরহানউদ্দিনে উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ করা হয়। পুলিশ বিপ্লবের অ্যাকাউন্ট হ্যাকের প্রমাণ পায় এবং দুই জনকে গ্রেফতার করে। তবে ফেসবুকে কথিত বক্তব্যের জেরে একটি পক্ষ উত্তেজনা ছড়ায়। রবিবার (২০ অক্টোবর) সকাল ১১টায় বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদরের ঈদগাহ মাঠে প্রতিবাদ সভার ঘোষণা দেওয়া হয়। পুলিশ সেখানে সতর্ক অবস্থান নিলেও একটি গ্রুপ ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশ করে মানুষকে উত্তেজিত করতে থাকে এবং পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরে ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও গুলি চালায়। এতে চার জন নিহত হন। আহত হন ১০ পুলিশসহ প্রায় দেড়শতাধিক লোক।

সহিংসতার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে সারাদেশে পুলিশকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে।
এ ঘটনায় ভোলার জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক মামুদুর রহমানকে প্রধান করে ওই দিনই (রবিবার) তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইটি অ্যান্ড এডুকেশন) আতাহার মিয়া ও ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল মহসিন আল ফারুক।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাত পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। রবিবার (২০ অক্টোবর) রাতে বোরহানউদ্দিন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবিদ হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে ভোলা জেলায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সোমবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ