ইলিশ প্রজননে ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর এ ২২ দিন নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এই আইনকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের জেলেরা এ সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ রেখেছে। তবে এই আইন তোয়াক্কা করছে না ভারতীয় জেলেরা। তারা বাংলাদেশের জলসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করে প্রতিনিয়ত পদ্মার ইলিশ আহরণ করছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজশাহীর মৎস্যজীবীরা। তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পদ্মাপাড়ের জেলে সিদ্দিক আলীর বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। ইলিশ শিকার করেই তার সংসার চলে। তিনি জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাছ শিকার বন্ধ রেখেছেন তিনি। এখন তার অলস সময় কাটছে। অথচ আইনের তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশের জলসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করে পদ্মার ইলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় জেলেরা।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় ২৬ কিলোমিটার পদ্মার জলসীমা রয়েছে। এ পদ্মার জলসীমানার মধ্যে ভারতীয় জেলেরা ইলিশ ধরছে।
জানা গেছে, পদ্মায় বাংলাদেশের জলসীমায় এমনই এক অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারতীয় জেলে প্রণব মণ্ডলকে আটক করায় গত ১৭ অক্টোবর রাজশাহীর চারঘাট সীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে বিজিবির গোলাগুলি হয়েছে। আটক জেলে এখন রাজশাহীর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
এ ব্যাপারে চারঘাট উপজেলার আরেক জেলে ইয়াকুব বলেন, বরাবরই ভারতীয় জেলেরা মাছ ধরতে আসে। কিন্তু সেদিন প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে যাওয়ায় বিজিবির একদম সামনে পড়ে যায় ভারতীয় জেলে প্রণব মণ্ডল। পরে তাকে ধরে নিয়ে আসা হয়। আমরা সরকারি আইন মেনে মাছ ধরছি না আর তারা মাছ ধরে নিয়ে চলে যাচ্ছে।
চারঘাট উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর মা মাছ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞার সময় ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করে ইলিশ শিকার করে। তারা নিষেধাজ্ঞা জেনেও এই কাজ করছে।
বাঘা উপজেলার সরেরহাট মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ইলিশ নিধনে নিষেধাজ্ঞার সময় ভারতের জেলেরা আমাদের সীমানার মধ্যে এসে মাছ ধরে। আর আমরা নৌকা তুলে রেখেছি। এ বিষয়ে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে কয়েক বছর ধরে স্মারকলিপি দিচ্ছি। তারপরও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
পদ্মার পলামি ফতেপুর চরের জেলে শহিদুল হক, গাওপাড়া গ্রামের নুর হোসেন, মুক্তার হোসেন, জহুরুল হক, আলাইপুর-কিশোরপুর গ্রামের মিলন হোসেন ও আলেখ আহম্মেদ বলেন, ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত পদ্মায় ইলিশ প্রজননে আসে। তাই সরকার ২২ দিন ইলিশ শিকার, আহরণ, পরিবহন, মজুত ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে। আমরা এ আইনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পদ্মায় ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। কিন্তু ভারতীয়রা নির্বিঘ্নে মাছ শিকার করছে।
এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘চারঘাটের ঘটনার পর থেকে ভারতীয় জেলেদের পদ্মা নদীতে আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। তবে এ ঘটনার আগে ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জলসীমায় প্রবেশ করে ইলিশ মাছ ধরেছে।’
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা বলেন, ‘পদ্মা নদীর জলসীমা অনুযায়ী আমাদের জনবল সংখ্যা কম। এরপরও আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে মা ইলিশ সংরক্ষণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
বিজিবি-১ এর অধিনায়ক ফেরদৌস জিয়াউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘পদ্মায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজশাহীতে জলসীমা রয়েছে ৭৮ কিলোমিটার। দুই দেশের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। কিন্তু জলসীমায় পদ্মার ভাঙনে অনেক জায়গা ফাঁকা রয়েছে। সেখান দিয়ে কৌশলে এসে ভারতীয় জেলেরা মাছ ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু গত ১৭ অক্টোবর ভারতীয় এক জেলেকে আটকের পর রাজশাহীর চারঘাট সীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে বিজিবির গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে ভারতীয় জেলেদের আনাগোনা নেই। সেইসঙ্গে সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ কড়া পাহারায় রয়েছে।’
এদিকে জানা গেছে, ৯ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় মা ইলিশ মাছ সংরক্ষণের জন্য ১৫৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৪৯ কেজি ইলিশ মাছ জব্দ, ৭ লাখ ৪০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল জব্দ, ১০টি মামলা ও ১৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে- জেলেদের নৌকায় ও প্রতিটি জালেই পাওয়া যাচ্ছে মা ও জাটকা ইলিশ। প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে ইলিশ শিকারিদের জেল-জরিমানা করলেও থামেনি ইলিশ শিকারিদের দৌরাত্ম। সরকারি নিষেধাজ্ঞার মাঝে নতুন কৌশলে ট্রলারগুলোতে কোনও বাতি ব্যবহার করছে না অসাধু জেলেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ১০টি গ্রুপ- বাঘা উপজেলার কালিদাশখালি, চকরাজাপুর, দিয়াড়কাদিরপুর, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, আলাইপুর, কিশোরপুর, মীরগঞ্জ এলাকায় মা ইলিশ ধরে বিক্রি করে।
জিজ্ঞাসাবাদে পদ্মাপাড়ের জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে দিনে কড়াকড়ি থাকায় সন্ধ্যার পর থেকে ভোররাত পর্যন্ত ইলিশ ধরছে অনেকে। সেই মাছ নৌকা থেকে নামিয়ে নদী তীরের ঝোঁপ-জঙ্গলে, কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখা ছাড়াও মজুত করা হয় বিভিন্ন বাড়িতে। আর মোবাইলে ক্রেতাকে ডেকে নিয়ে তা বিক্রি করা হচ্ছে। অসাধু ব্যক্তি ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল কিংবা অটোরিকশায় গিয়ে সস্তায় কিনে আনছে মা ইলিশ।
এক মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, ৫শ’ থেকে ৬শ’ গ্রামের প্রতি কেজি ইলিশ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, ৭শ’ থেকে ৮শ’ গ্রামের প্রতি কেজি ইলিশ ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং এক কেজি সাইজের ইলিশ ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাট-বাজারে কোথাও ইলিশ বিক্রি হয় না। তবে কিছু জেলে চুরি করে মাছ ধরে বিক্রি করছে, এটা সত্য। টানা কয়েকদিন বৃষ্টিতেও পদ্মায় নৌকায় অভিযান চালানো হয়। তারা ভেবেছিল, বৃষ্টিতে অভিযান বন্ধ থাকবে। কিন্তু অভিযান চালিয়ে ইলিশ ও জাল জব্দ করা হয়েছে।’








