স্বামীর লাশের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার স্ত্রীকেও আটক করে পুলিশ

Send
জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৯:৩১, নভেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩০, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

 

জামালপুর‘পানি আনতে শুক্রবার রাত ৮টার দিকে ঘর থেকে বের হই। ঘরের পেছনে লুকিয়ে থাকা রফিজ উদ্দিন (৩৮), ছানোয়ার (৩৪) ও শাওন (২৫) আমাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। এরপর ছানোয়ারের বাড়ির পেছনে জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ এবং অনেক মারধর করে। পরে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে আরও নির্যাতন চালায়। খবর পেয়ে ওই তিন পাষণ্ডের হাত থেকে বাঁচাতে আমার স্বামী দৌড়ে আসেন। আমাকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা আমার স্বামীকে মারধর করতে করতে নিয়ে যায়। একটু পরে ফিরে এসে বলে, তোর স্বামী আত্মহত্যা করেছে। আমার স্বামী কেন আত্মহত্যা করবে? আমার স্বামীকে ওরা খুন করেছে। মেরে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে। আমি অনেক কান্নাকাটি করেছি স্বামীকে দেখার জন্যে। ওরা দেখতে পর্যন্ত দেয়নি। সারা রাত গাছে বেঁধে নির্যাতন করেছে। শনিবার সকালে পুলিশ এসেছে শুনে তারা আমার বাঁধন খুলে ছানোয়ারের বাড়ির একটি রুমে নিয়ে আটকে রাখে। পরে পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে। আমার স্বামীর লাশ নিয়ে যায়। পুলিশকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের কথা বলেছি। আমার স্বামীকে খুনের কথা বলেছি। স্বামীর লাশের সঙ্গে তারা আমাকেও নিয়ে যায়। আমার কোনও অভিযোগ তারা নেয়নি। এস আই মো. গোলজার আলম আমার স্বামীকে হত্যা এবং আমাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে কোনও গুরুত্বই দেননি।’

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ওই নারী কাঁদতে কাঁদতে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন। জামালপুর সদর উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর এলাকায় গত শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) রাতে ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। ভিকটিম জানান, রফিজ উদ্দিন (৩৮), ছানোয়ার (৩৪) ও শাওন (২৫) দীর্ঘদিন ধরে তাকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। তাদের পাত্তা না দিয়ে স্বামী ও শ্বশুরকে বিষয়টি জানানোয় ক্ষিপ্ত হয়ে তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ভিকটিম অভিযোগ করেন, ধর্ষণকারীরা তার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়।
ওই গৃহবধূ বলেন, ‘আমি পুলিশকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্যাতনের কথা বলেছি। স্বামীর এমন মৃত্যুতে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। পুলিশ স্বামীর লাশের সঙ্গে আমাকেও নিয়ে যায়। তবে আমার কোনও অভিযোগ তারা আমলে নেয়নি। স্বামীকে হত্যা এবং আমাকে ধর্ষণের অভিযোগে কোনও গুরুত্বই দেয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের পর আমাকে তারা ছেড়ে দেয়। পরে আমি বাধ্য হয়ে বিচারের আশায় প্রেস ক্লাবে আসি। আমি স্বামী হত্যার এবং আমাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বিচার চাই।’

জামালপুর প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকরা সোমবার রাতে এ ঘটনা শোনেন এবং গৃহবধূকে রাত ১০টায় জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। ওই গৃহবধূ প্রসূতি ওয়ার্ডে আছেন। সাংবাদিকদের হস্তক্ষেপে সোমবার রাত ১১টার দিকে ছানোয়ার, রফিজ ও শাওনসহ মোট পাঁচজনকে আসামি করে এ ঘটনায় মামলা হয়। রাতেই শাওনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ছানোয়ার ও রফিজ পলাতক রয়েছে। তাদের বাড়িতে কেউ নেই।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক হাসানুল বারী শিশির জানান, ‘ওই গৃহবধূর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের আলামতও পাওয়া গেছে। ডাক্তারি পরীক্ষার পরে এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার হওয়া যাবে। তাকে সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

ভিকটিমের শ্বশুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলে মারা গেছে। সে মারা গেছে নাকি আত্মহত্যা করেছে আমি জানি না।’

শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল হক বলেন, ‘ওই নারী প্রথমে ঘটনাটি আমাকে জানায়নি। পরে জানতে পেরে পুলিশে খবর দেই। নির্যাতনকারীরা দিনমজুর শ্রেণির। তারা কোনও প্রভাবশালীর সহায়তা পাবে না। নির্যাতনকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে আমি অবশ্যই ভিকটিমের পরিবারকে সহায়তা করবো।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস আই মো. গোলজার আলম বলেন, ‘শনিবার লাশ উদ্ধারের পর ওই নারী ধর্ষণের অভিযোগ করেননি। থানা থেকে চলে গিয়ে তিনি এ কথা বলেছেন।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেমুজ্জামান বলেন, ‘আমরা শ্রীপুরের রামকৃষ্ণপুর এলাকার এক ব্যক্তির আত্মহত্যার খবর পাই। পরে পুলিশ ওই ব্যক্তির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। আত্মহত্যা না হত্যা তা জানার জন্য লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে সেটা জানা যাবে। তবে ধর্ষণের বিষয়ে প্রথমে কেউ অভিযোগ দেননি। তিনি আমার কাছেও আসেননি। বিষয়টি আমি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানি। পরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলা নেওয়া হয়েছে। এক আসামি গ্রেফতারও হয়েছে। পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ সঠিক নয়। অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

জামালপুরের পুলিশ সুপার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওই মহিলা ধর্ষণের বিষয়ে আমাদের কাউকে কিছু বলেননি বা কোনও অভিযোগ দেননি। না জানালে আমরা জানবো কীভাবে? তিনি আমাদের কাছেও আসেননি। ধর্ষণের বিষয়টি সোমবার সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পারি। পরে ওসি সাহেবকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলা রেকর্ড করার কথা বলি।’

আরও পড়ুন- স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, স্বামীকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা!

/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ