তিন মাসও টিকলো না প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামত করা বেড়িবাঁধ

Send
খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৭:৩৯, মে ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫২, মে ৩১, ২০২০

আম্পানের আঘাতের আগে হরিণখোলা বাঁধ

খুলনার কয়রা উপজেলায় দরপত্র আহ্বান ছাড়াই প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি মেরামত করা তিনটি বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ঘাটাখালী বাঁধের জরুরি মেরামত কাজ ৬ মাস আগে, হরিণখোলা ও ২ নং কয়রার বাঁধের কাজ ৩ মাস আগে শেষ হয়েছে। সম্প্রতি আম্পান-এর আঘাতে জরুরি মেরামত করা তিনটি বাঁধই ভেঙে গেছে।




স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে মূলত এ সব বেড়িবাঁধ নড়বড়ে হয়ে যায়। এরপর থেকেই বাঁধগুলো কেবল মেরামত করে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য পথটি সুগম করা হয়েছে। আদতে বাঁধ মজবুত করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে এ সব বাঁধে জরুরি মেরামত কাজের নামে অর্থ অপচয় হয়েছে। কিন্তু বাঁধগুলো কয়রাবাসীর উপকারে আসেনি।
উপজেলার গোলখালী গ্রামের নিবাসী আশাফুর রহমান জানান, ঘাটাখালীতে জরুরি কাজের দৃশ্য তিনি নিজেই পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেখানে মাটি ফেলে কাজ করার ফলে জরুরি কাজটিও ছিল দুর্বল। যা নির্ধারিত মাপের চেয়ে ৩ ফুট নিচু করা হয়। আর ভূমিতে ৩০ ফুটের স্থলে ৫-৭ ফুট করা হয়। তখন এসব অনিয়ম বন্ধ করে সঠিকভাবে কাজ করানোর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা বিষয়টি আমলে নেননি। ফলে এখন আম্পানের আঘাতে সেই স্থানই ভেঙেছে। আর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

আম্পানের আঘাতের আগে হরিণখোলা বাঁধ
কয়রা উপজেলা উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জরুরী কাজের নামে যে কয়টি বাঁধ মেরামত করা হয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই আম্পানের আঘাতে ভেঙে গেছে। কয়রায় আসলে বেড়িবাঁধে জরুরি কাজের নামে অর্থ লুটপাট হয়েছে।
উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুর ই আলম সিদ্দিকী বলেন, বুলবল আঘাত করার পর ২নং কয়রার গোবরার আশপাশ এলাকার বেড়িবাঁধের সঙ্গে ড্রেজার মেশিন রেখে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পুকুর ভরাটের খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। এরপর তিনি ওই বালু উত্তোলন বন্ধ করেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়রার এস ও মশিউল আবেদনী বলেন, জরুরি মেরামতের জন্য দরপত্র প্রয়োজন হয় না। অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও কাজ করার মতো ঠিকাদারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্ষমতার রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে কাজ করলেই ঠিকাদার সমুদয় পাওনা পান না। ঢাকা থেকে পর্যবেক্ষণ টিম আসে। তারা সরেজমিন পরিদর্শন করার পর প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনে কোনও ধরনের আপত্তি না হলে অর্থ বছর শেষে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার টাকা পান।
মশিউল আবেদনী বলেন, কয়রা সদর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের ৩টি পয়েন্টে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি মেরামত কাজ করা হয়েছে। এর মধ্যে এস এম শফিকুল ইসলাম তার কাজের ৪০ শতাংশ বিল পেয়েছেন। কাজ শেষ হতেই ঢাকার পর্যবেক্ষক টিম এসে দেখে গেছেন। তারা প্রতিবেদন এখনও জমা দেননি।

আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করার পর বাঁধ
তিনি জানান, জরুরি মেরামত কাজের আওতায় বাঁধের মাথায় ৮ ফুট রেখে সে হিসেবে উচ্চতা ৫ ফুট আর ভূমিতে ২৮ ফুট হিসেবে কাজ করার কথা ছিল। কাজগুলো সেভাবেই হয়। ফনির আঘাতের পর ঘাটাখালীতে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় পৃথকভাবে ৩০০ মিটার করে ৬০০ মিটার কাজ করা হয়। যা এস এম শফিকুল ইসলাম করেন। এ কাজের জন্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। আর হরিণখোলা ও ২নং কয়রার কাজ করেছেন হুমায়ুন কবীর। হরিণখোলার কাজের জন্য ২২ লাখ টাকা ও ২নং কয়রার কাজের জন্য ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। ২নং কয়রার ২১০ মিটারের স্থলে ৬০ মিটার কাজ করা হয়েছিল। পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন সন্তোষজনক হলে সেই হিসেবেই বিল পাবেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আরও জানান, আম্পানের আঘাতে কয়রার ১২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৪০ কিলোমিটার কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮ কিলোমিটার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে কয়রায় বাঁধ মেরামতের জন্য ২৫০ কোটি টাকার চাহিদা দেওয়া হয়েছে। আগেও কয়রার বাঁধ মেরামত করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে, অতিজরুরি কাজগুলো ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে করিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল।
কয়রা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর জানান, হরিণখোলা ও ২নং কয়রার বেড়িবাঁধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করেছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনা পেয়েই তিনি কাজ করেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ওই কাজের অর্থ তিনি পাননি। আর বাঁধের যে স্থানে তিনি কাজ করেছিলেন, সে স্থান ঠিকই আছে। আম্পানে ওই বাঁধের দুর্বল থাকা অন্যস্থান থেকে ভেঙেছে। তার কাজ করা স্থান এখনও ঠিক আছে।
কয়রা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি গত অর্থ বছরে ফনির আঘাতের পর কয়রার ঘাটাখালিতে জরুরি মেরামতের কাজ করেছিলেন। ওই কাজের অর্থ এখনও তিনি পাননি। আর যেখানে কাজ করেছিলেন সেখানে বাঁধের কোনও ক্ষতিই হয়নি।

/এএ/

লাইভ

টপ