বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না করোনাসেবায় ব্যবহৃত খুলনার হোটেল-হাসপাতালের কর্মীরা

Send
খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৩:৫৮, জুন ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৫, জুন ০৪, ২০২০

BT-Newকরোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই খুলনার চারটি আবাসিক হোটেল এবং ডায়াবেটিক হাসপাতালকে প্রশাসন থেকে কোয়ারেন্টিন ও রোগীর চিকিৎসার জন্য নিয়ে নেওয়া হয়। গত দুই মাস যাবৎ এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের ১২০ জন কর্মী এখন পর্যন্ত কোনও বেতন-ভাতা পাননি। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের বেতন-ভাতার অর্থ প্রাপ্তির আবেদন করেও সাড়া পায়নি। বেতন-ভাতা না পেয়ে কর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে, হোটেল মালিকরা আর্থিক সংকটে কর্মী না পেয়ে করোনাসেবায় হোটেল বরাদ্দ দেওয়ায় অনীহা প্রকাশ করছেন। এ কারণেই গত সোমবার (১ জুন) রাতে খুলনার হোটেল মিলেনিয়ামে নতুন চিকিৎসকদের কোয়ারেন্টিনের সুযোগ প্রদানে আপত্তি করা হয়।

কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীরা খুলনার হোটেল মিলেনিয়াম, হোটেল অ্যাম্বাসেডর, হোটেল রয়্যাল এবং সিএসএস আভা সেন্টারে অবস্থান করেন।

খুলনার ডায়াবেটিক হাসপাতালের চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. আব্দুস সবুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটির নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন নিয়েছে। এর ফলে গত দুই মাস ধরে বেসরকারি এ প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সেবা প্রদান বন্ধ রয়েছে। আয়ও হচ্ছে না। তাই হাসপাতালটিতে ৪৫ জন কর্মীর বেতন-ভাতাও দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তারা এখন দিশেহারা। এ কারণে ঈদের আগে স্টাফদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৫৬ লাখ টাকার প্রণোদনা চেয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে একটি আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ব্যাপারে কোনও সাড়া মেলেনি। এজন্য স্টাফদের কোনও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করা যাচ্ছে না।’

খুলনার হোটেল মিলেনিয়ামের ভাড়া গ্রহীতা শেখ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘করোনার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি হোটেলটি ভাড়া নিয়েছিলেন। এরপরই করোনার কারণে প্রশাসন থেকে ডাক্তারদের কোয়ারেন্টিনের জন্য হোটেলটি নিয়ে নেওয়া হয়। হোটেলের ১০ জন কর্মী এ পর্যন্ত প্রশাসনের এ কাজে নিরবচ্ছিন্নভাবে সার্ভিস দিয়ে এসেছে। কিন্তু ঈদে তাদের বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের সার্পোটের জন্য প্রথম ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষে হোটেল থেকে ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকার একটি বিল জেলা প্রশাসনের কাছে ঈদের আগেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে প্রশাসন থেকে কোনও সাড়া মেলেনি। কর্মীরা কোনও অর্থ না পেয়ে যে-যার মতো চলে গেছে। হোটেলটি এখন জনবল শূন্য হয়ে পড়েছে। এর ফলে রাতে ডাক্তারদের হোটেলে থাকাটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই নতুন করে আসা ডাক্তারদের এখানে থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। হোটেল থেকে এ বিষয়টি থানা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকেও লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, দ্বিতীয় দফায় আরও প্রায় এক লাখ টাকার বিল প্রস্তুত করা হচ্ছে।

মিলেনিয়াম হোটেলের স্টাফ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তার আয়ের ওপর ছয় জন নির্ভরশীল। তিনি দুই মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। ফলে বাসার লোকজন নিয়ে তাকে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় হোটেলের কাজের বাইরে ভিন্ন কিছু চিন্তা করতে হচ্ছে। এ কারণে হোটেলে আর আগের মতো সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

খুলনা রয়েল হোটেলের ম্যানেজার শেখ সাইফুল ইসলাম জানান, তার হোটেলের ১০টি কক্ষ প্রশাসন থেকে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে গত দুই মাসের বিল হিসাব করে ১২ লাখ টাকার ওপরে হয়েছে। যা জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থ সঙ্কটের কারণে হোটেলের ৮৫ জন স্টাফের বেতন-ভাতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

রয়েল হোটেলের নিরাপত্তারক্ষী মো. মহিদুল ইসলাম জানান, তার সংসারে পাঁচ জন রয়েছেন। পরিবারের সবাই তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। দুই মাস বেতন না পেয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এ বিষয়ে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘জেলা প্রশাসক নিজেই হোটেল রিক্যুইজিশন করেছেন এবং হোটেল মিলেনিয়াম ডাক্তারদের কোয়ারেন্টিনের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই মিলেনিয়াম হোটেল থেকে বাধা দেওয়ায় সাময়িক সমস্যা সৃষ্টি হয়। রাতেই ডাক্তারদের হোটেল অ্যাম্বাসেডরে নেওয়া হয়।  এ সব বিষয় নিয়ে মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে এ বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি এ কমিটির প্রধান থাকবেন। এছাড়া খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা সিভিল সার্জন অফিস ও পুলিশের প্রতিনিধি এ কমিটিতে থাকবেন। তারাই হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেবেন।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ‘হোটেলগুলো রিক্যুইজিশন করা হয়েছে। আইন অনুযায়ীই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ পাবেন। হোটেলগুলো থেকে কর্তৃপক্ষ বিল জমা দিয়েছেন। সেগুলো যাচাই-বাছাই করাসহ সার্বিক বিষয়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি আলোচনার পর সুপারিশ জমা দিলেই বিষয়টি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী হোটেল মালিকরা বিষয়টি নতুনভাবে দেখার জন্য অনুরোধ করেছেন। প্রশাসন থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’ 

/এমএএ/

লাইভ

টপ