কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে শিম্প্রপাড়া সংগ্রহশালা

Send
জসিম উদ্দিন মজুমদার, খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত : ২১:১৩, জুলাই ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২০, জুলাই ০৪, ২০২০

কৃষক পন্য কালেকশন পয়েন্টে  একত্রিত করছেশতাধিক কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে শিম্প্রপাড়া সংগ্রহশালা। কৃষকেরা উৎপাদিত কৃষি সামগ্রী তাদের গ্রামের এই সংগ্রহশালায় এনে জড়ো করেন। পরে এখান থেকে পাইকাররা এসব কৃষিজ সামগ্রী কিনে নিয়ে যান। এতে করে কৃষক একদিকে বাজারে যাওয়া এবং পরিবহন খরচ থেকে যেমন রেহাই পান, তেমনি পাইকারেরা ভালো দামে কিনে নেওয়ায় কৃষকেরা গ্রামে থেকেই নায্য মূল্য পাচ্ছেন।

সংগ্রহশালাটি মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের শিম্প্রপাড়া গ্রামে অবস্থিত। এটি জেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার এবং উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। শিম্প্রপাড়ায় প্রায় শতাধিক কৃষকের বসবাস যারা সবজি, আম, কাঁঠাল, আনারসসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। সংগ্রহশালা শুরুর আগে কৃষকদের তাদের পণ্য নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরে মানিকছড়ি বাজারে যেতে হতো। এটি একই সঙ্গে ব্যয় ও কষ্টসাধ্য বিষয় ছিল। এখন তারা উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য এই সংগ্রহশালায় এনে জড়ো করেন, যেখানে পাইকারেরা ট্রাক নিয়ে এসে এসব সামগ্রী কিনে নিয়ে যান। ফলে কৃষকেরা বেশ লাভবান হচ্ছেন, তাদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে।বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হচ্ছে পণ্য

কথা হয় সংগ্রহশালা পরিচালনা পরিষদের সভাপতি কৃষক ফোরকান আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, ২০১৯ সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও  জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনডিপির সহযোগিতায় যৌথভাবে বাস্তবায়িত কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের বাজার সংযোগ কার্যক্রমের আওতায় এই সংগ্রহশালার যাত্রা শুরু। কৃষকদের সুবিধার্থে  দলগতভাবে পণ্য একত্রিত করে বিক্রির জন্য এলাকায় এই সংগ্রহশালা (মার্কেট কালেকশন পয়েন্ট) করে দেওয়া হয়।। সংগ্রহশালাটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য কৃষক ও কৃষিপণ্য ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে পাঁচ জনের একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে।

তিনি আরও জানান, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় ‘মাঠ স্কুল’ থেকে কৃষকেরা দলগতভাবে  গুণগত মানের পন্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেন। কৃষকেরা পণা বাজারজাতকরণের আগে পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য পরিষ্কার করা, বাছাই ও গ্রেডিং করে ভালোকরে মোড়কজাত করা বিষয়ে জানেন। আগে এসব কৃষিজ সামগ্রী দূরের বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হতো। এতে পণ্য পরিবহনে সময় নষ্ট, পরিবহন খরচ এবং রাস্তায় ক্ষতির সম্মুখিন হওয়ার ঝুঁকি ছিল। এছাড়া বাজারদর সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এবং এককভাবে বিক্রি করার ফলে খুব বেশি লাভ হতো না।২

শিম্প্রপাড়া সংগ্রহশালা (কালেকশান পয়েন্ট) পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রবিউল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে এ সংগ্রহশালায় আশেপাশের ১০ গ্রামের ১২০০ কৃষক পরিবার সম্পৃক্ত রয়েছেন। কৃষকেরা প্রশিক্ষণ পাওয়ায় তাদের পণ্যের গুণগত মান ভালো হয়। এছাড়া খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ির বাইরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও কৃষকদের সংযোগ স্থাপন হয়েছে। গত এপ্রিল-জুন এই তিনমাসে শিম্প্রপাড়া সংগ্রহশালা মাধ্যমে দুই হাজার মন সবজি, ২০ লাখ পিস লিচু, এক লাখ ২০ হাজার পিস কাঁঠাল, ১৮ শত মন আম এবং ১০ হাজার আনারস বিক্রি হয়েছে যার বাজার মূল্য এক কোটি ৫০ লাখ টাকা।’৩

তিনি আরও বলেন, ‘সংগ্রহশালা হওয়ার আগে কৃষকেরা শাক-সবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় করতে যার-যার মতো করে। বাজারদর  ও গুণগত মানের পণ্য উৎপাদন সম্পর্কে ধারণা না থাকায় একেকজন একেক রকম দাম পেতেন। কিন্তু সংগ্রহশালা হওয়ায় কৃষকেরা বাজারদর সম্পর্কে জানছেন এবং একই দাম পাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। স্থানীয় ও জেলার বাইরের অনেক ব্যবসায়ী সংগ্রহশালায় আসার ফলে প্রতিযোগিতা মূলক বাজার তৈরি হয়েছে এবং কৃষকরা সর্বোচ্চ দাম পাচ্ছেন।’

ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম বলেন, তিনি শিম্প্রপাড়া সংগ্রহশালা থেকে গত ৩ মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সবজি ও ফল কিনেছেন, যা স্থানীয় তিনটহরী, গুইমারা বাজারসহ খাগড়াছড়ির বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, ঢাকার বড় বাজারগুলোতে সরবরাহ করেছেন।

বড় বাজারে পরিবহনের জন্য পন্য গাড়িতে তোলা হচ্ছে

 

আরেক ব্যবসায়ী আদম আলী বলেন, চলতি মৌসুমে তিনি এই সংগ্রহশালা থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকার সবজি ও ফল কিনে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী, নরসিংদীর বড় বড় বাজারে সরবরাহ করেছেন। তার মতো এখানে আরও ২০-২৫ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা পণ্য কিনে স্থানীয় বাজার ও বাইরের বাজারে সরবরাহ করেন। বর্তমানে ব্যবসা করে তিনি নিজে যেমন ভালো দাম পাচ্ছেন, তেমনি কৃষকরাও ভালো লাভ করতে পারছেন।

কাছের বাজার সমূহে পন্য পরিবহন

 

স্থানীয় বাটনাতলী ইউপি মেম্বার মংপাইপ্রু মারমা বলেন, ‘শিম্প্রপাড়া সংগ্রহশালা স্থাপন হওয়ায় এখানকার কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। তারা উৎপাদিত সামগ্রী বলতে গেছে ঘরে বসে বিক্রয় করতে পারছেন ও লাভবান হচ্ছেন।’

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী জানান, দুর্গম এলাকার কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনা করে ইতোমধ্যে জেলা পরিষদ থেকে ২৭টি সংগ্রহশালা (কালেকশান পয়েন্ট) করে দেওয়া হয়েছে। আরও ১১টি চলতি মাসের মধ্যে করে দেওয়া হবে। কৃষকেরা ঘরে বসে নায্যমূল্য পাবেন, লাভবান হবেন, এই লক্ষ্যেই এসব সংগ্রহশালা করে দেওয়া হয়েছে।

 

/এফএস/

লাইভ

টপ