খুলনায় ‍বাসা থেকে দুই পাটকল শ্রমিককে তুলে নিয়ে গেলো কারা?

Send
মো. হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
প্রকাশিত : ২১:৪৮, জুলাই ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩৫, জুলাই ০৬, ২০২০

খুলনায় নিখোঁজ দুই পাটকল শ্রমিক নেতা নুর ইসলাম ও ওলিয়ার রহমান।প্রশাসনের পরিচয়ে রবিবার (৫ জুলাই) দিনগত রাতে পৃথকভাবে দুই শ্রমিককে নিজ নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরা হচ্ছেন প্লাটিনাম জুটমিলের নুর ইসলাম ও ইস্টার্ন জুটমিলের ওলিয়ার রহমান। তাদের সন্তানদের দাবি, ১৮ ঘণ্টা ধরে খোঁজ নেই এই দুই শ্রমিকের। তবে কারা তাদের তুলে নিয়ে গেছে সে বিষয়ে প্রশাসনের কেউই তাদের কোনও তথ্য দিতে পারেননি।

নুর ইসলামের বড় ছেলে মো. জুয়েল দাবি করেছেন, রবিবার দিনগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে ৫টি গাড়ি নিয়ে সাদা পোশাকে কিছু লোক খালিশপুর ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে অবস্থিত তাদের বাড়িতে আসেন এবং বাড়িতে আগুন লেগেছে বলে চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় তার পিতা নুরুল ইসলাম জানালা খুলে উঁকি দেন। তখন তারা বলেন, ভাই এটা আপনার বাড়ি? দরজা খুলে নিচে নামেন। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আসছে, কাজ করবে। এরপর তিনি নিচে নামলে তাকে ধরে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়। বহরে ৪টি সাদা মাইক্রোবাস ও পুলিশের একটি গাড়ি ছিল। তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তারা কোনও জবাব না দিয়ে বকাঝকা করেন এবং গাড়ি চালিয়ে চলে যান।

এ সময় গাড়ি থামাতে গিয়ে ‍জুয়েলের ছোট ভাই জনি দোতলা থেকে পড়ে আহত হয়। এরপর থেকে জুয়েল খালিশপুর থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ অফিসে যোগাযোগ করলেও নুর ইসলামের কোনও সন্ধান তারা দিতে পারেনি। তিনি থানায় জিডি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অন্যদিকে, ইস্টার্ন জুটমিলের শ্রমিক ওলিউর রহমানের ছেলে নাইম শেখ বলেন, রাত আড়াইটার দিকে ৯ জন সশস্ত্র লোক মিলগেটের সামনে থাকা তাদের বাড়িতে আসেন এবং তার বাবাকে ডেকে নিয়ে চলে যান। তাকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তারা কোনও উত্তর না দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। তাদের হাতে পুলিশের ওয়্যারলেস ছিল। এরপর থানা ও ডিবি কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও পিতার সন্ধান পাননি নাইম। এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নাইম আরও জানান, এদিন বিকেলে তাদের বাসায় ৯ জন শ্রমিক একত্রিত হয়েছিলেন। তারা আলোচনা শেষে সন্ধ্যার আগেই যে যার মতো চলে যান।

প্লাটিনাম জুটমিলের সিবিএ সভাপতি শাহানা শারমিন বলেন, মিলের স্থায়ী শ্রমিক নুর ইসলামকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি। তবে কারা, কী কারণে নিয়ে গেছে তা এখনও জানতে পারিনি। আমরা তার সন্ধান করার চেষ্টা করছি।

গণসংহতি আন্দোলন খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক মুনীর চৌধুরী সোহেল বলেন, সরকার পাটকল বন্ধের যে চক্রান্ত করছে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মধ্যে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। এই আন্দোলন যাতে সংগঠিত না হতে পারে তার জন্য রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ হিসাবে প্রশাসন দিয়ে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা কোথায় আছেন, কেমন আছেন তা আমরা এখনও জানতে পারিনি। অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবি করছি।

এদিকে বাম দলের কেন্দ্রীয় নেতা জোনায়েদ সাকী তার ফেসবুকে এ সংক্রান্ত বিষয়ে এক পোস্টে উল্লেখ করেন, গত রাতে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা তুলে নিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত খুলনার খালিশপুর থানা কিংবা খানজাহান আলী থানা কেউ স্বীকার করেনি শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম ও ওলিয়ার রহমানকে গ্রেফতারের কথা। প্লাটিনাম জুটমিল ও ইস্টার্ন জুটমিলের এই দুই শ্রমিক নেতাসহ সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া সবাইকে অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে।

সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক কোনও ওয়ারেন্ট ছাড়াই ধরে নিয়ে যাওয়ায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট খুলনা জেলা সভাপতি জনার্দন দত্ত নান্টু ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে তাঁদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।

গণসংহতি আন্দোলন, খুলনা জেলা কমিটির আহ্বায়ক মুনীর চৌধুরী সোহেল, সদস্য সচিব মারুফ গাজী, ছাত্র ফেডারেশন খুলনা মহানগর আহ্বায়ক আল আমিন শেখ, সদস্য সচিব অনিক ইসলাম এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে ষড়যন্ত্র করে আসছিল সরকার। সম্প্রতি পাটকল বন্ধে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় এর বিরুদ্ধে যেন কোনও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে না উঠতে পারে তার জন্যই এই দুই শ্রমিক নেতাকে আটক করা হয়েছে। পাটকল ও পাটশিল্প রক্ষার জন্য সাধারণ শ্রমিকরা দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসছে। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ পাটশিল্প রক্ষা কমিটির উপদেষ্টা শ্রমিক নেতা নূরুল ইসলাম এবং আহ্বায়ক শ্রমিক নেতা ওলিয়ার রহমান কোথায় কী অবস্থায় আছেন তা জানতে চান। একইসঙ্গে তাঁদের সম্পূর্ণ সুস্থাবস্থায় অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।

খালিশপুর থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাব্বিরুল আলম বলেন, থানায় কোনও শ্রমিককে আনা হয়নি। পুলিশের কাছে এ ধরনের কোনও অভিযোগও আসেনি।

বিষয়টির সঙ্গে সরকারের অন্য কোনও গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত কিনা সে ব্যাপারে কোনও তথ্য অবগত নন বলেও জানান তিনি।

খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলামও বলেন, আমরা কোনও শ্রমিক নেতাকে আটক করিনি।

/আরআইজে/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ