টালমাটাল সিরাজগঞ্জে লীগের শত্রু লীগপরস্পরের বিরুদ্ধে ৫ মামলায় আসামি ৬৬০

Send
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০৪:৫৪, জুলাই ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৫:০৪, জুলাই ১৩, ২০২০

সিরাজগঞ্জে ছাত্রলীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষ। এতে জড়িয়ে পড়ে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগও।







ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হক বিজয়কে হত্যা ও তার পরবর্তী সংঘর্ষ-পাল্টা সংঘর্ষের ঘটনা প্রবাহে টালমাটাল এখন সিরাজগঞ্জ। ছাত্রলীগের ছোট অন্তর্কলহ গায়ে মাখায় প্রথমে তা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের দ্বন্দ্ব থাকলেও জমাট বাঁধা ক্ষোভ ও কোন্দলের জেরে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে যুবলীগ আর স্বেচ্ছাসেবক লীগও। প্রকাশ্যে দু ভাগ হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে মাঠে নামা এ সংঘর্ষে জড়িত হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগেরও অনেক নেতা-কর্মী। ফলে সিরাজগঞ্জে এখন লীগের শক্র লীগ। আর তাতে আগুনে ঘি ঢেলেছে পরস্পরের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৫টি মামলা। যাতে মোট আসামির সংখ্যা ৬শ’ ৬০ জন। এর ফলে সংগঠনগুলোর প্রথম স্তরের সব নেতা-কর্মীই মামলাগুলোতে আসামি হয়েছেন, যারা বাদ পড়েছেন মামলা থেকে তাদের রেহাই পাওয়াও কঠিন। কারণ এসব মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে ৩৮০ জনকে। পুলিশ বলেছে, ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আর আসামি খুঁজবে তারা।

সদর থানায় শনিবার সর্বশেষ দায়ের করা মামলাটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারায়।  মামলা দায়ের করেন গুরুতর আহত জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল হকের স্ত্রী মুক্তা খাতুন। একই সংগঠনের সভাপতি রাশেদ ইউসুফ জুয়েল, জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ বিন আহম্মেদ, সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান সোহেল, আরেক সাবেক সভাপতি জাকিরুল ইসলাম লিমন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, স্বেচ্ছাসেবকলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জেহাদ আল ইসলামসহ ৭৫জনকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। এতেই শেষ নয় মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ১৫০ জনকে।

আর আগে দায়ের হওয়া ৪টি মামলায় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আহসান হাবীব খোকা, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ বিন আহম্মেদ, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল হক (সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন), জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম আহম্মেদ, তার ভাই ও শহর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান আহমেদ, যুবলীগ নেতা এমদাদুল হক, একরামুল হক রিজভীসহ গুরত্বপূর্ন অনেক নেতাকর্মী আসামি হয়েছেন।

ফলে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দায়েরকৃত ৫ মামলায় আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ অঙ্গ সংগঠনের ৬’শ ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে মামলাগুলোতে নাম উল্লেখ করা আসামি ২৮০ জন, আর অজ্ঞাত হিসেবে ধরা হয়েছে আরও ৩৮০ জনকে। একটি রাজনৈতিক সংগঠনের মূল ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের পরস্পরের করা এমন মামলায় জেলার অধিকাংশ তরুণ রাজনীতবিদের আসামি হওয়ার ঘটনা সাধারণত দেখা যায় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা বলেছেন, গত ২৬ জুন ও ৭ জুলাই ঘটা সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনাগুলো শহরের প্রধান সড়কে প্রকাশ্যে দিবালোকে ঘটেছে। সেগুলোর অনেক সিসিটিভি ও ক্যামেরা ফুটেজ ও ছবিও আছে পুলিশসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী  সংস্থা এবং গণমাধ্যমের কাছে। তাই সবগুলো মামলায় এত অজ্ঞাত আসামি রাখাটাও বেশ রহস্যজনক। আবার মামলাগুলোতে একই ব্যক্তিদের একাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে। এরইমধ্যে পুলিশ গত ক’দিনে ৩০ জনকে গ্রেফতার করলেও মুল অভিযুক্তরা এখনও অধরা এবং পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

সিরাজগঞ্জে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপে সংঘর্ষ

অন্যদিকে, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও কামারখন্দ হাজী কোরপ আলী ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এনামুল হক বিজয় হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি শিহাব আহম্মেদ জেহাদকে এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ।




সদর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা এ প্রতিবেদককে বলেন, ঘটনাগুলো দিনের বেলা বা প্রকাশ্যে ঘটলেও আসামিদের ঠিকমতো চিনতে না পারায় বাদীগণ এজাহারে অজ্ঞাত আসামি হিসেবে তাদের উল্লেখ করেছেন। তদন্ত শেষে সত্যিকারে দায়ী বা অভিযুক্তদের নামই চার্জশিটে উল্লেখ করে আদালতে দাখিল করা হবে।

ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, ৫ মামলায় ৩৪জন গ্রেফতার হয়েছেন। পুলিশের অভিযানে কারণে অপরাধীরা সটকে পড়েছে। বিজয় হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি শিহাব আহম্মেদ জেহাদকে ধরার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।



প্রসঙ্গত প্রয়াত সাবেকমন্ত্রী আলহাজ মোহাম্মদ নাসিমের দোয়া মহফিলে আসার পথে গত ২৬ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে জেলা শহরের বাজার স্টেশন এলাকায় হামলার শিকার হন এনামুল হক বিজয়। দলীয় কোন্দলের জেরে বিজয়কে মারধর ও কুপিয়ে আহত করা হয়। ৯দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। এরপর বিজয়ের জন্য জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে দোয়া মাহফিল ডেকে সেখানে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে যুবলীগের সভাপতি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে এবং যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগের সভাপতির পক্ষ নিয়ে এই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় আওয়ামী লীগ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও কিছু নেতা কর্মী উভয় পক্ষে ভাগ হয়ে গেলে এই সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। এতে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক  একরামুল হক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ বিন আহম্মেদ  ও যুবলীগ সভাপতি আহসান হাবীব খোকার নেতৃত্বাধীন গ্রুপের হামলার শিকার হয়ে এখন রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এদিকে, করোনার মধ্যে দলীয় এমন অন্তর্কলহের বিষয়টি আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা মেনে নিতে পারেননি। সরকারও বিষয়টি নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। ফলে স্বরাষ্ট্রসহ দুটি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে  সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের ডেকে নিয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে বলেন এমন ঘটনা অব্যাহত থাকলে আইন নিজের গতিতে চলবে। এরপর এসব মামলা দায়ের হলে পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারে তৎপর হয়।

/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ