শিশু নোহা’র মৃত্যুরহস্যবাবা করেছেন ‘আত্মহত্যা’য় প্ররোচনার মামলা, মা‌য়ের দা‌বি ‘বা‌লিশ চাপা দি‌য়ে হত্যা’

Send
বরিশাল প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০১:১৬, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৩৬, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০

নুসরাত জাহান নোহা

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নোহা’র মৃত্যুরহস্য ক্রমেই জটিলতর আকার ধারণ করেছে। মাত্র ৯ বছরের এই শিশুটি সত্যিই আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি উঠেছে পরিবার থেকেই। গত বৃহস্পতিবার ( ১০ সেপ্টেম্বর) স্কুল শিক্ষকের মারধরের কারণে শিশুটি অভিমানে আত্মহত্যা করেছে এমন দাবি করেন তার বাবা সুমন মিয়া। এরপর ওই স্কুল শিক্ষক শফিকুল ইসলামকে অভিযুক্ত করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন তিনি। তবে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) শিশুটির প্রকৃত মা তানিয়া বেগম আদালতে পৃথক এজাহার দায়ের করে দাবি করেছেন তার মেয়েকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য শিশুটির বাবা, সৎ মা ও ফুপুকে দায়ী করেছেন তিনি। আদালত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মামলাটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের খাজুরিয়া গ্রাম। এ গ্রামেই বাড়ি সুমন মিয়ার। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বদরাগী ও বিয়ে পাগলা বলে এলাকায় পরিচিত আছে সুমন মিয়ার। এখন পর্যন্ত বিয়ে করেছেন চারটি। সুমনের মেয়ে নুশরাত জাহান নোহা (৯) ছিল তার আগের ঘরের সন্তান। নোহার মা তানিয়া বেগমকে তালাক দেওয়ার পর চতুর্থ বিয়ে করেন সুমন। তবে আদালতের মাধ্যমে মেয়েকে নিজের কাছে রেখে দেন তিনি। তার বর্তমান স্ত্রী ঝুমুর জামান আগের ঘরের সন্তান নোহাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখতো না। নোহা পড়তো স্থানীয় মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে।

গত বুধবার মারা যায় নোহা। সেদিন শিশুটির বাবার দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, নিজেদের টিনশেড ঘরের দোতালায় আড়ার সঙ্গে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস দেয় নোহা। তার ঘর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্বজনরা। বুধবার দুপুরে নিজ বাড়ি থেকে নোহাকে উদ্ধার করে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় পয়সারহাটের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয় দারুল ফালাহ প্রি ক্যাডেট স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তো নোহা। তবে ওই স্কুলের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম নোহাকে মারধর ও বকা দিয়েছিল এমন অভিযোগ আনেন নোহার বাবা সুমন মিয়া।

নোহার মায়ের দায়ের করা হত্যা মামলার তিন আসামি নোহার বাবা সুমন মিয়া, নোহার সৎ মা ঝুমুর জামান ও বোন লিপি বেগম। ডানে নোহা

এ ‘আত্মহত্যা’র ঘটনায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে বৃহস্পতিবার দুপুরে দারুল ফালাহ প্রি ক্যাডেট স্কুলের সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম ওরফে সুমন পাইককে আসামি করে মামলা দায়ের করেন নোহার বাবা সুমন মিয়া। 

এ মামলা দায়েরের পরপরই নোহার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

মামলার বাদী নোহার বাবা তার এজাহারে জানান, নোহা স্কুল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় বুধবার ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম তাকে মারধর করেন। এতে সে অপমানিত বোধ করে বাসায় ফিরে কান্নাকাটি করে। এক পর্যায়ে ক্ষোভে অভিমানে পরিবারের সকলের অগোচরে টিনশেড ঘরের দোতালায় আড়ার সাথে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস দেয়। পরিবারের সদস্যরা টের পেয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা আমার শিশু কন্যাকে উদ্ধার করে ক্লিনিকে নিয়ে যায়। ক্লিনিকের চিকিৎসক সকল ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নোহাকে মৃত ঘোষণা করেন। এজাহারে সুমন মিয়া অভিযোগ করেন, ওই শিক্ষকের খারাপ আচরণের কারণেই তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।

তবে এ ঘটনার চারদিন পর সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নোহার প্রকৃত মা তানিয়া বেগম বরিশালের সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শাম্মি আক্তারের আদালতে পৃথক এজাহার দায়ের করেন। এই এজাহারে তিনি দাবি করেন, তার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি, তাকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য এজাহারে তার সাবেক স্বামী ও প্রয়াত নোহার বাবা সুমন মিয়াকে মূল আসামি করে তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আবেদন করেন তিনি। এ মামলার অপর আসামিরা হচ্ছেন সুমনের চতুর্থ স্ত্রী ঝুমুর জামান ও সুমনের বোন লিপি বেগম। আদালত মামলার আর্জি বাতিল বা গ্রহণ কোনটিই করেননি। তিনি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর মামলাটি নথিভুক্ত করা এবং ওই পর্যন্ত নথির কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

তানিয়া বেগম তার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট সুমন মিয়া তাকে তালাক দেন। এরপর থেকে তিনি ঢাকায় বসবাস করে আসছেন। তার সন্তান নোহাকে সুমনের পিতা ( নোহার দাদা) আব্দুর রহিম মিয়া খুব আদর করতেন। কিন্তু তা সহ্য করতে পারতেন না সুমন ও তার স্ত্রী ঝুমুর। ঘটনার দিন গত ৯ সেপ্টেম্বর নোহা উপজেলার দারুল ফালাহ প্রি ক্যাডেট একাডেমিতে সাপ্তাহিক পরীক্ষা দিতে যায়। সেখানে কম নম্বর পাওয়ায় শিক্ষক তাকে বকাঝকা ও লাঠি দিয়ে পেটায় বলে ওই পরিবারের সকলকে জানায়। এ জন্য ঘরে বসে সে কিছুক্ষণ কান্নাকাটিও করে।

বাদীর দাবি এ ঘটনাকে পুঁজি করে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তার মেয়ে নোহাকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে আসামিরা। এরপর গামছা ও ওড়নায় যুক্ত করে নোহাকে আড়ার সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে আত্মহত্যার প্রচার চালানো হয়। এমনকি বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করতে সুমন মিয়া বাদী হয়ে শিক্ষক সুমন পাইককে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। যা ছিল সম্পূর্ণ সাজানো নাটক।

এজাহারে বলা হয়, ৯ বছরের একটি শিশু আত্মহত্যার কথা চিন্তাও করতে পারে না। সেখানে গামছা ও ওড়না যুক্ত করে আড়ার সাথে ফাঁস দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ কারণে তিনি আদালতে ওই তিনজনকে আসামি করে হত্যা মামলার এজাহার জমা দিয়েছেন বলে জানান।

তানিয়া বেগম বলেন, তালাকের পর আমি মামলা দায়ের করি। ওই মামলায় আদালতের বিচারক আমার মেয়ে নোহাকে তার বাবার জিম্মায় দেন। নোহার মৃত্যুর দুই দিন আগে তার দাদা আমাকে (তানিয়া) ফোনে জানিয়েছিলেন নাতির জন্য সম্পত্তি লিখে দেবেন যাতে ভবিষ্যতে নোহার কোনও কষ্ট না হয়। নোহার দাদার সম্পত্তি লিখে দেওয়ার ওই কথাটাই নোহার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

নুসরাত জাহান নোহা

বাগধা ইউনিয়নের খাজুরিয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠিত দারুল ফালাহ প্রি-ক্যাডেট একাডেমীর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন জানান, শনিবার বিকেলে পরিচালনা কমিটির জরুরি সভা ডেকে মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক সুমন পাইককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনিও দাবি করেন, নোহা পরিবারের সদস্য দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। নোহার নামে তার দাদা জমি লিখে দিতে চেয়েছিলেন। সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় পরিবার সদস্যরা তাকে হত্যা করতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আরও জানান, দীর্ঘদিন বন্ধের পর গত ৫ সেপ্টেম্বর স্কুলের মাসিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিন পরে ওই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয় বুধবার দুপুরে। প্রকাশিত ফলাফলে নোহা ৩০ মার্ক পেয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় স্কুলের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম সুমন পাইক নোহাকে বেত্রাঘাত ও গালমন্দ করেন।

তিনি জানান, মাদ্রাসা খোলা হয়নি। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার গতি বজায় রাখতে একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। যা অনলাইনের নেওয়ার নিয়ম থাকলেও গ্রামে সকলের ঘরে ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় স্কুলে এনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পরীক্ষা নেওয়া হয় মাত্র।

আগৈলঝাড়া থানার ওসি আফজাল হোসেন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকবে তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে। তা করা হবে অতি দ্রুততার সাথে।

/টিএন/

লাইভ

টপ