কবে ফাঁকা হবে নিউ ঢাকা রোড, কবে মিলবে মুক্তি?

Send
আমিনুল ইসলাম রানা, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত : ২০:১৩, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২৩, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

 

সব পথ রুদ্ধ। কোনপাশে কে যাবে? কে দেবে ছাড়! (সাম্প্রতিক ছবি)

সিরাজগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি ব্যস্ততম সড়কের নাম নিউ ঢাকা রোড। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি পার হওয়ার সময় সব পথচারীর ভ্রু কুঁচকে থাকে, অনেকের মেজাজও হয় তিরিক্ষি। কারণটা অনুমেয়। এম.এ.মতিন বাস টার্মিনাল হতে মালসাপাড়া কবরস্থান পর্যন্ত শহরের গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের মাত্র এক কিলোমিটার অংশ স্বাভাবিকভাবে পার হওয়ার উপায় নেই। যানজট আর যানবাহনের এলোমেলো পার্কিং এখানে পথচারীদের কাছে যেন ‘অত্যাচারের’ মতো। সারাক্ষণই এই সড়কে যাত্রীদের তটস্থ থাকতে হয় সামনে-পেছনে বাসের উপস্থিতি নিয়ে, এসব বাস কোথায় দাঁড়াবে, কোন পাশ দিয়ে যাবে, আদৌ যাবে কিনা বা কখন যাবে কেউ তা বলতে পারে না। বাস চলে বাসচালক-হেলপারদের মর্জি মাফিক। এমন হওয়ার কারণ, বাস টার্মিনাল থাকার পরেও এ সড়কে একটু পর পর বানানো হয়েছে অবৈধ বাস কাউন্টার। তবে এগুলো উচ্ছেদের যেন কেউ নেই।  ফলে সারাক্ষণই যানজট লেগে থাকে নিউ ঢাকা রোডে। জেলা ঘোষণার পর থেকে গত ৩৬ বছর ধরে গণপরিবহনের এমন এলোমেলো চলাচলের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জেলা আইন শৃঙ্খলাসভায় ১৩ বছর ধরে এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সমাধানের পথ আজও খুঁজে পাননি শহরবাসী।

সিরাজগঞ্জের নিউ ঢাকা রোডে এমন যানজট দিনভর থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। (সাম্প্রতিক ছবি)

স্থানীয় এক বাড়িঅলা বলেন, সম্প্রতি সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে পৌরসভা থেকে জেলা শহরের এম.এ.মতিন বাস ট্রার্মিনালের সম্প্রতি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। শহরবাসীর প্রত্যাশা ছিল বাস টার্মিনাল সংস্কারের পর নিউ ঢাকা রোডে গায়ের জোরে স্থাপিত সার্ভিস বাসের অবৈধ কাউন্টারগুলো অপসারণ করা হবে। কিন্তু তা হয়নি, বরং গন্তব্যস্থলে ছেড়ে যাবার আগে যাত্রী সংগ্রহে টার্মিনালের মুখের সামনে যত্রতত্র বাস রেখে যানজট তৈরি করছে শ্রমিকরা। ট্রার্মিনালের পূর্বদিকে বাজার স্টেশন স্কয়ার ও মুক্তির সোপানে সিএনজি-অটোরিকশা, ব্যাটারি-রিকশা ও ইজিবাইকের বেশ ক’টি স্ট্যান্ড রয়েছে। অবৈধভাবে এসব স্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে অনেকটা গায়ের জোরেই। কাজিপুর, এনায়েতপুর ও বেলকুচি রুটের ডজনখানেক বাস বাজার স্টেশনে সকাল-সন্ধ্যা গায়ের জোরে যাত্রী ওঠানামা করে। ঢাকার মহাখালী, মিরপুর ও কালশি রুটসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটে বেশ ক’টি সার্ভিস বাসের অবৈধ কাউন্টারও রয়েছে বাজার স্টেশনে।

অন্যদিকে, নিউ ঢাকা রোডে ট্রাক শ্রমিক অফিসের পাশে জিআরপি থানার সামনে রেলের সরকারি জায়গায় রয়েছে অবৈধ মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড। রেল কলোনি মহল্লার রেলইয়ার্ড থেকে নিউ ঢাকা রোডে পাথর, ভুট্টা ও সিমেন্টের ক্লিঙ্কারবাহী আমদানি করা শতাধিক ট্রাকেরও চলাচল রয়েছে। অদূরেই গোশালা রেলগেইট মোড়ে সিএনজি-অটোরিকশা, ব্যাটারি-রিক্শা ও ইজি বাইকসহ বেশ ক’টি রিকশা স্ট্যান্ডও রয়েছে। এখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সরকারি জায়গায় কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ট্রাকস্ট্যান্ডও রয়েছে। মোটর সাইকেল মেকানিকস, ট্রাক-বাস ডেন্টিং-ফেন্ডিংসহ ভলকানাইজিং দোকান আছে সারি সারি, এ বাদেও এ সড়কের মালসাপাড়া কবরস্থানের সামনে রয়েছে কাজিপুরের মিনি বাসস্টপ।

মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে যানবাহনের অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে ইজারা প্রদান বা রাজস্ব আদায়ে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানা হয় না সিরাজগঞ্জ জেলা শহরে। এ শহরে যত্রতত্র যান চলাচলে কৃত্রিম যানজট নিরসনে অভিযান চালাতেই যত অনীহা ট্রাফিক বিভাগ, পুলিশ বাহিনীসহ স্থানীয় প্রশাসন, এমনকি পৌর কর্তৃপক্ষের। জেলা আইন শৃঙ্খলা ও মাসিক উন্নয়ন সভায় প্রায়ই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এজেন্ডা হিসেবে এলেও এসব বৈঠকে চলে কর্তৃপক্ষগুলোর ঠেলাঠেলি। এরপর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে মাঝেমধ্যেই রেজুলেশন করা হলেও তা লিখিত থাকে শুধুই কাগজ-কলমে। বাস্তবে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। গত ৯ আগস্টও এমন রেজ্যুলেশন হয়েছে একটি। তবে এক মাসেও কোনও সমাধান পায়নি এলাকাবাসী।

নিউ ঢাকা রোড-একপাশে ট্রাক, আরেকপাশে বাস আটকে রেখেছে পথ। ব্যবসায়ীদের বাজে বারোটা! (সাম্প্রতিক ছবি)

ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) সৈয়দ মিলাদুল হুদা স্বীকার করেন, নিউ ঢাকা রোডে অবৈধভাবে সার্ভিস বাস কাউন্টার ও সিএনজি এবং ইজিবাইক স্ট্যান্ড গড়ে ওঠায় শহরের প্রধান এ ব্যস্ততম সড়কে প্রায়ই এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ বিআরটির সহকারী পরিচালক ও জেলা আরটিসি সভার সদস্য সচিব মো. আতিকুর রহমান বলেন, শহরের নিউ ঢাকা রোডে অবৈধভাবে যারা যানবাহন রেখে পরিবহন ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা ছাড়া শুধু আইন প্রণয়ন ও রেজুলেশন করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, যত্রতত্র যানবাহনের চলাচল নিয়ে গত ৯ আগস্ট জেলা আইন শৃঙ্খলা সভায় আলোচনা ও রেজুলেশনও হয়েছে।

তবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু জানাতে পারেননি তিনি।

দুর্বিসহ এই যানজট থেকে মুক্তি চান সিরাজগঞ্জ শহরবাসী। (সাম্প্রতিক ছবি)

পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম বলেন, শহরের বাজার স্টেশন, গোশালা রেলগেইট ও কাঠেরপুলে সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ডগুলোর বৈধতা নিয়ে আমি নিজেও মেয়রের সাথে আলোচনা করেছি। মেয়রকে এসব স্ট্যান্ডের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছে। তবে তিনি দেখাতে পারেননি।

জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, শহরের যত্রতত্র যান চলাচল ও যানজটের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব মূলত পৌর মেয়রের। তাকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি অভিযানের উদ্যোগ নিলে আমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেবো ও পুলিশ সুপার চাহিদা অনুযায়ী পুলিশ পাঠাবেন।

সদর পৌরসভার সচিব মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘গত ২৩ মার্চ সর্বশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। করোনার কারণে অভিযান ঠিকমতো করা হয়নি।’

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সালাম বলেন, ‘এটা অনেকদিনের সমস্যা। ট্রার্মিনাল সংস্কারের পর আশা করেছিলাম যে যানজট নিরসন হবে। কিন্তু হয়নি। এ ব্যাপারে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’

নিউ ঢাকা রোড নামের এই সড়কটি ‘যন্ত্রণার সড়ক’ নামেও ডাকেন অনেকে। (সাম্প্রতিক ছবি)

মেয়র সৈয়দ আব্দুর রউফ মুক্তা বলেন, জেলা আইন শৃঙ্খলা সভায় এসব সমস্যা নিয়ে বার বার আলোচনা করেছি। আমার হাতে তো আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই। শহরের মাঝখান থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড সরানোর বিষয়টি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ব্যস্ততম এস.এস রোড ও মুজিব সড়কে অহেতুক দীর্ঘক্ষণ রিকশা দাঁড়িয়ে থেকে যানজট সৃষ্টি করছে। এসব রিকশাকে সেখানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতে না দিতে ও রিকশার বৈদুতিক বেল অপসারণের জন্য এরইমধ্যে পৌরসভার লোকজনকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। ফুটপাতে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধেও খুব শিগগিরই অভিযান শুরু হবে। টাঙ্গাইল ও বগুড়াসহ অনেক জেলার পৌর এলাকায় চলাচলরত বাস, ট্রাক ও অটোরিকশায় স্বাভাবিকভাবে টোল আদায় করা হচ্ছে।

জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আলহাদি আলমাজি জিন্নাহ বলেন, শহরের বাজার স্টেশন এলাকায় পৌরসভার কোনও বৈধ বাস বা সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড নেই। তারপরেও পৌর কর্তৃপক্ষ কিভাবে সেখানে টোল আদায় করছে প্রশাসনের এসবও দেখা উচিত।

/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ