পুলিশের চাকরি করেও তিনি বড় চাষি

Send
নয়ন খন্দকার, ঝিনাইদহ
প্রকাশিত : ০৯:০০, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৫৩, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

গোলাম রসুলের বাগানে ধরেছে গাছভর্তি থোকায় থোকায় মাল্টা।

২০০৪ সালে মাটির ব্যাংক ভেঙে কিনেছিলেন ৩৩টি মোজাফ্ফর লিচুর চারা। সেই চারা লাগিয়েছিলেন দুই বিঘা জমিতে। ২০০৯ সালে সেই গাছ থেকে লাখ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে শুরু করেন। এরপর পৈত্রিক ১২ বিঘা জমি আর লিচু বিক্রির টাকায় লিজ নিয়ে বর্তমানে ২৫ বিঘা জমিতে সমন্বিত দেশি বিদেশি ফলের আবাদ গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে কর্মরত উপসহকারী পুলিশ পরিদর্শক গোলাম রসুল। তিনি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাষ্টভাঙা ইউনিয়নের মাসলিয়া গ্রামের মৃত আবুল হোসেন বিশ্বাসের ছেলে।

তার সমন্বিত ১৬ বিঘা জমিতে রয়েছে চায়না কমলা, দার্জিলিং কমলা, মেন্ডারিন কমলা, বারি-১ মাল্টা, কাশ্মিরি আপেল কুল, বল সুন্দরী কুল, মিশরি বারোমাসি শরিফা, থাই শরিফা, সিডলেচ সুগন্ধি কাগজি লেবু, মোজাফফর লিচু, চায়না-২ জাতের লিচু, থাই-৫ জাতের পেয়ারা, থাই-৭ জাতের পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের আবাদ। বাকি ৯ বিঘা জমিতে ড্রাগনসহ অন্যান্য ফলের আবাদ করার জন্য প্রস্তুতি চলছে। এ বছর আম্ফানের কারণে লিচু বিক্রি করতে পারেননি। তারপরও দেড় লাখ টাকার লিচু বিক্রি হয়েছে। তিন বিঘা জমিতে আবাদ করা কুল বিক্রি করেছেন ৫ লাখ ও  সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে রোপণ করা পেয়ারা বিক্রি করেছেন প্রায় ৮ লাখ টাকায়। চলতি মৌসুমে এবার এসব বাগান থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন তিনি।

নিজের বাগানে গোলাম রসুল।

গোলাম রসুল জানান, ছোটবেলা থেকে তার মা ও বড় ভাই মৃত আব্দুল মান্নান মাস্টারের ফলজ ও বনজ গাছ লাগানো এবং পরিচর্যা দেখে তিনি গাছপ্রেমী হয়ে পড়েন। এরপর একই গ্রামের মন্টু চাচার কামরাঙ্গা, জলপাই, কদবেল গাছ লাগানো দেখে লোভে পড়ে যান। একবার ঈদের দিন মামা বাড়িতে যান এবং মামা মামির দেওয়া সালামির ২৭ টাকা দিয়ে একটি কামরাঙ্গা গাছ কিনে বাড়িতে রোপণ করেন। সেই গাছের ফল দেখেই তিনি নিজেই বাগান করার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত হন।

২০০৪ সালে প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম তার ২ বিঘা জমিতে লিচু গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন গোলাম রসুলকে। তারই পরামর্শে বাড়ির কাউকে কিছু না বলে মাটির ব্যাংক ভেঙে যশোর জেলার বসুন্দিয়া থেকে তিনি ৩৩টি মোজাফ্ফর জাতের লিচু গাছ ক্রয় করে আনেন ও তা লাগান। তখন বাড়ির অভিভাবকরা বকাঝকাসহ অনেকে তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন। এরপর ২০০৫ সালে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পদে যোগদান করেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি উপসহকারী পুলিশ পরিদর্শক হন। ২০০৯ সালে সেই লিচু গাছে ফল ধরে।  ফলন দেখে অভিভূত হয়ে যান গোলাম রসুল। সেই থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করছেন। জীবনের প্রথম লাগানো লিচু বাগানের টাকায় বাড়ির গেটও করেছেন বলে জানান। 

বাগানের কমলা গাছের পাশে গোলাম রসুল।

বর্তমানে চাকরির কারণে তিনি বাড়িতে থেকে নিজে বাগান দেখাশোনা করতে পারছেন না। তবে গাছের ফলন দেখে এ কাজে তাকে সহায়তা করছেন তার অন্যান্য ভাই।  তার নির্দেশনায় তার ভাই মিজানুর রহমান মাস্টার ও অন্য ভাইয়েরা ফলের বাগান দেখাশোনা ও পরিচর্যা করছেন। ছুটিতে বাড়িতে এলে তিনি সারাক্ষণ ফলের বাগানেই পড়ে থাকেন। সম্প্রতি বাড়িতে আসার পর তার সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের।

গোলাম রসুল জানান, এ বছর দুই বিঘা জমিতে মিসরের জাতের বারোমাসি শরিফা ও থাই বারোমাসি শরিফা ফলের গাছ লাগিয়েছেন। সেই গাছের মধ্যে সাথী ফসল হিসেবে লাগিয়েছেন শীতকালীন পাতাকপি। দুই বিঘা জমিতে ১৫০টি শরিফা গাছ লাগানো হয়েছে। যার দাম পড়েছে ৭৫ হাজার টাকা। এছাড়া সাথী ফসল হিসেবে সাত হাজার ৫শ’ টাকার পাতাকপি লাগিয়েছেন।

তিনি জানান, শরিফা গাছ লাগানোর দুই বছর পর পরিপূর্ণ ফল পাওয়া যায়। প্রতিবছর সেখানে থেকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার শরিফা ফল পাওয়া যাবে। আর শীতকালীন সাথী ফসল থেকে ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার ফলন পাবেন। এছাড়া তিনি ৫ লাখ টাকার বিভিন্ন ফলের চারাও বিক্রি করেছেন।

বাগানে লাগিয়েছেন নতুন নতুন ফলের চারা।

তার সেই ক্ষেতে কাজ করছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষিত যুবকরা। করোনার মধ্যে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় মাসলিয়া গ্রামের কামরুল, সাগর, রাতুল, রানা, ইয়াসিন, সামাউল, মাহাবুর, সাহেব আলীর মতো প্রায় ৫০ জন শিক্ষিত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী তার বাগানে পার্টটাইম কাজ করছে। এদের একেকজন পেয়ারায় ১২শ’ পলিথিন বাঁধলে ৫শ’ টাকা করে পায়। এছাড়া বাগান বা ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করার জন্য আলাদাভাবে দিনমজুররা কাজ করেন।

মাসলিয়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, সাইদুল ইসলাম, কামাল হোসেন, বিল্লাল হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, গোলাম রসুলের ফলের বাগান দেখে তারাও উদ্বুদ্ধ হয়ে ফলের বাগান করেছেন। গোলাম রসুলের কাছ থেকে বিভিন্ন ফলের চারাও কিনেছেন। গ্রামের এসব চাষী আরও বলেন, গোলাম রসুল সরকারি চাকরি করেন। এলাকায় না থেকেও তিনি যখন ফলের আবাদ করতে পারছেন তাহলে আমরা কেন পারবো না? গোলাম রসুল আমাদের গ্রামের একজন আদর্শ ছেলে। চাকরি করেও তিনি কৃষিতে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পুলিশের চাকরির কারণে নিজের বাগানে এখন তেমন সময় দিতে পারেন না। কিন্তু, এলাকায় সবাই তাকে ডাকে সফল চাষি হিসেবে। এলাকার তরুণরা তার আদর্শে উজ্জীবি হয়ে বাগান করায় মন দিচ্ছে এখন।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলী হোসেন বলেন, গোলাম রসুল ও তার ভাইরা বিভিন্ন প্রকার ফলের আবাদ করে কৃষিতে অবদান রাখছেন। আমিও তাদের চিনি। তাদের বাগানেও একাধিকবার গিয়েছি এবং কৃষি বিষয়ক পরামর্শ দিয়েছি। এছাড়াও গোলাম রসুল সাহেবের সঙ্গে মোবাইল ফোনে প্রায়ই আমার যোগাযোগ হয়। চাকরি করেও তিনি একজন বড় চাষি।

/টিএন/

লাইভ

টপ
X