নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে বুধবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হচ্ছে হিন্দু ধর্মালম্বীদের স্নানোৎসব। ইতোমধ্যেই দেশ বিদেশের পুণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে লাঙ্গলবন্দের কয়েক কিলোমিটার এলাকা।
‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’ এ মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে জগতের যাবতীয় সংকীর্ণতা ও পঙ্কিলতার আবরণে ঘেরা জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় হিন্দু পুণ্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান শুরু করবে।
বুধবার দিবাগত রাত ৩টা ২৪ মিনিট ৩২ সেকেন্ড থেকে শুরু হওয়া তিথি শেষ হবে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৪৭ মিনিট ৭ সেকেন্ডে। স্নানোৎসব সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতে সেখানে পুরো তিন কিলোমিটার এলাকায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎযাপন পরিষদের তথ্য ও যোগাযোগ উপকমিটির আহ্বায়ক দিলীপ কুমার মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ থেকে সাবদি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ১৬টি ঘাটে জড়ো হয়ে স্নান করবে লাখো পুণ্যার্থী। এ বছর লাঙ্গলবন্দে ১০ থেকে ১৫ লাখ পুণ্যার্থীর আগমন আশা করছেন তারা।
বাংলাদেশ হিন্দু কল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় সদস্য রনজিৎ মোদক জানান, এবার ললিত সাধুর ঘাট,অর্ণপূর্ণ ঘাট, রাজ ঘাট, কালীগঞ্জ ঘাট, মা কুঁড়ি সাধুর ঘাট, মহাত্মা গান্ধী ঘাট, বড় দেশ্বরী ঘাট, জয়কালি ঘাট, রক্ষাকালী ঘাট, প্রেম তলা ঘাট, চর শ্রীরাম ঘাট, সাবদি ঘাট, বাসনকালী ও জগৎবন্ধু ঘাটে স্নান করা হবে।
লাঙ্গলবন্দের ৩ কিলোমিটার সিসি ক্যামেরার আওতায়
অষ্টমীর স্নান উপলক্ষে লাঙ্গলবন্দে আগত পুণ্যাথীদের জন্য নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। লাঙ্গলবন্দের তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। এ ছাড়াও তীর্থ স্থানের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে রয়েছে পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। লাঙ্গলবন্দে আগত পুণ্যাথীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে র্যাব, পুলিশ, আর্মড পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও আনসার।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন জানান,এ বছরের স্নান উদযাপন উৎসব সুন্দর করতে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাস্তার দুপাশে কোনও ভিক্ষুক, মেলা স্টল,সংঘবদ্ধ যুবক, নদী পথে বাল্কহেড, রাস্তায় ট্রাফিক, গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো বন্ধ থাকলে পুণ্যার্থীদের জন্য স্নান সহজ হবে। দুর্ঘটনা এড়াতে সাতটি মেডিক্যাল টিম, ফায়ার সার্ভিস,এক হাজার পুলিশ, ১০০ সেচ্ছাসেবকসহ ১০টি পয়েন্টে ২০টি সিসি টিভি ক্যামেরা বসানো হবে। এর সঙ্গে ছয়টি পয়েন্টে পুলিশের ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার থাকবে।
এখানে উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নানোৎসবে প্রচণ্ড ভিড়ে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়।আহত হন আরও ৩০ জন।
পুরানে লাঙ্গলবন্দ স্নানের কাহিনী
লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সম্পর্কে হিন্দু পুরানে আছে, ত্রেতাযুগের সূচনাকালে মগধ রাজ্যে ভাগীরথীর উপনদী কৌশিকীর তীর ঘেঁষে এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল যার নাম ভোজকোট। এ নগরীতে ঋষি জমদগ্নির পাঁচ পুত্র সন্তানের মধ্যে নাম যথাক্রমে রুষন্নন্ত, সুষেণ, বসু, বিশ্বাসুর ও সবার ছোট পরশুরাম। পরশুরামের জন্মকালে বিশ্বজুড়ে চলছিল মহাসঙ্কট। একদিন পরশুরামের মা রেণুকা দেবী জল আনতে গঙ্গার তীরে যান। সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরী গণসহ)। পদ্মমালীর রূপ এবং তাদের সমবেত জলবিহারের দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে যে, তিনি তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, ঋষি জমদগ্নির হোমবেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার মোটেও খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে রেণুকা দেবী কলস ভরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। তপোবলে ঋষি জমদগ্নি সবকিছু জানতে পেরে রেগে গিয়ে ছেলেদের মাকে হত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার ছেলে মাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। পরবর্তীকালে পিতা খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে তিনি মা এবং ভাইদের প্রাণ ফিরে চান। তাতেই রাজি হন ঋষি জমদগ্নি। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেন না তিনি। একপর্যায়ে পিতার কথামত পরশুরাম তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায়। পরশুরাম ভাবেন, এই পুণ্য বারিধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ খুব উপকৃত হবে। তাই তিনি হাতের খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন তিনি। ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। এই জন্য এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। এরপর এই জলধারা কোমল মাটির বুক চিরে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। পরবর্তীকালে এই মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।
/বিটি/এনএস/এমএসএম/







