প্রবল ইচ্ছাশক্তি যে একজন মানুষকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে এর উদাহরণ বগুড়ার বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী সুমাইয়া রহমান রিয়া। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক (এপিবিএন) স্কুল এন্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এর আগে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতেও সে জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
প্রতিবন্ধী হওয়ায় রিয়ার বর্তমান স্কুল একদিন তাকে ভর্তি করতে অপারগতার কথা জানিয়েছিল বলে জানালো তার পরিবার। আজ এই স্কুলের সবাই গর্বিত তাকে নিয়ে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমার শিক্ষকতা জীবনে এমন মেধাবী শিক্ষার্থী আর দেখিনি। রিয়া আমাদের গর্ব। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করি।
বগুড়া শহরের ফুলবাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী জাহেদুর রহমান রেজা ও গৃহিনী মাসুমা রহমান ফেন্সীর তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট রিয়া শুধু পড়াশোনাতেই নয়, মেধার ছাপ রাখছে চিত্রাঙ্কনেও। বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এ যাবত সে ৯০টির বেশি পুরস্কার জিতেছে।
১৯৯৮ সালের আগস্টে প্রতিবন্ধী হিসেবে পৃথিবীতে আসার পর বাবা-মা মানসিকভাবে কষ্টে ছিলেন। অনেক চিকিৎসা করিয়েও লাভ হয়নি। কিন্তু ছোটবেলা থেকে রিয়ার মেধা তাদের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। স্থানীয় মুখ ও বধির বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয় রিয়াকে। অনেক তদবিরের পর ২০০৯ সালে তাকে এপিবিএন স্কুল ও কলেজে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করানো সম্ভব হয়।
কথা বলতে ও শুনতে না পারায় প্রথমে শিক্ষক ও সহপাঠীরা তার ওপর বিরক্ত ছিল। পরিবার জানায়, প্রথম প্রথম সবাই রিয়াকে অবহেলা করতেন। কিন্তু পরে ভালো আচরণ, অসাধারণ স্মরণশক্তি দেখে শিক্ষকরা এগিয়ে আসেন। আর রিয়ার খুব ভালো একজন বন্ধুও জোটে। তার নাম আন্না।
ক্লাসে রিয়া শিক্ষকদের লেকচার শুনতে বা বুঝতে না পেরে শুধু করে তাকিয়েই থাকতো। বন্ধু আন্না তখন লিখে ও ইশারায় তাকে বুঝিয়ে দিত সব। এভাবে হাটি হাটি পা পা করে এগোতে এগোতে রিয়া পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে। তার ভেতর যে এক শিল্পীও যে লুকিয়ে ছিল, তা পরিবারের কাছে প্রকাশ পায় বাড়িতে যে কোনও ছবির অবিকল অঙ্কন দেখে। বাবা-মা তাকে ছবি আঁকা শেখানোরও ব্যবস্থা করেন।
আরও পড়ুন: পদ্মা সেতু নির্মাণের সমপরিমাণ টাকা পাচার হলেও, থোড়াই কেয়ার করি : যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত, ফকির লালন শাহ্সহ বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বে জীবন্ত সব ছবি এঁকে বিভিন্ন অংকন প্রতিযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে রিয়া ৯০টি সনদপত্র লাভ করে। এখানেই শেষ নয়। আরও আছে ৩০টি ক্রেস্ট ও একটি স্বর্ণসহ ২০টি মেডেল!
বাবা জাহেদুর রহমান রেজা জানান, রিয়া কথা বলতে ও শুনতে না পারলেও খুব মেধাবী। তার সামনে কে কী বলছেন, তা তাদের ঠোঁট নড়ানো দেখে ইশারায় সে বর্ণনা করতে পারে। মেয়ে প্রতিবন্ধী হওয়ায় প্রথমে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাকে ভর্তি করতে রাজি হয়নি। কোন শিক্ষক তাকে পড়াতে চাইতো না। অনেক শিক্ষক পরিবর্তন করতে হয়েছে। এরপরও তারা হাল ছাড়েননি।
গর্বিত মা মাসুমা রহমান ফেন্সী জানান, রিয়া বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হওয়ায় সে বাবা মা ছাড়া আর কারও কাছে গিয়ে পড়াশোনা করতে চায় না। এ কারণে বাড়ির কাছের সরকারি আজিজুল হক কলেজে সে পড়তে চায়।
/এইচকে/আপ-এআর/








