দেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র ভূমিতে অবস্থিত প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন শালবনের সন্ধান হয়তো অনেকেই জানেন না। নওগাঁ জেলা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা ধামইরহাট উপজেলার ২৬৪.১২ হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে এই শালবন।
শালবনে শুধু শালগাছ নেই পাশাপাশি অন্য গাছেরও দেখা মিলবে। মন জয় করা এই শালবনে প্রাণ জুড়াতে আসে দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক।
শালবনের পথ যেখানে শেষ সেখানেই ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। কাছাকাছি সীমান্তের পিলার। বেড়ার ওপাড়ে দেখা যায় ভারতীয়দের কৃষিকর্ম আর বিএসএফের টহল। এই বনের অন্যতম আকর্ষণ শালগাছকে জড়িয়ে উঠে গেছে হিংলো লতা, অনন্তমূল ও বনবড়ইসহ নানা লতাগুল্ম আর বনফুল। বনের ভেতরে ঢুকতেই নাকে ভেসে আসে নাম না জানা নানা রকমের বনফুলের মিষ্টি গন্ধ। আর মাঝে মাঝে আছে ঘন বেত বন। বেত গাছের সবুজ চকচকে চিকন পাতায় চোখ জুড়িয়ে আসে। এই বনে আছে সাপ, শিয়াল, খরগোস, বনবিড়াল ও বেজিসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণি আর পাখি। পাখির কলতানে মুখরিত সমগ্র শালবন।
তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও তেমন ভালো নয়। নওগাঁ শহরের বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে ৬০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যেতে হবে জেলার ধামইরহাট উপজেলা সদরে। পথে পড়বে মহাদেবপুর, পত্নীতলা উপজেলার সদর। ধামইরহাট থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার পথ পেরুলেই দেখা মিলবে প্রকৃতির আপন খেয়ালে সাজানো নয়নাভিরাম সেই প্রাচীন শালবনটি। ৬ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে লাল মাটির রাঙা পথ। দূর থেকেই নজরে পড়বে সেই প্রাচীন শালবনটি।
বনের দিকে যতই এগিয়ে যাবেন ততই অনুভূতি হবে রোমাঞ্চকর। পথের ধারে ছোট ছোট বসতবাড়িগুলোতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। বরেন্দ্র ভূমির চারিদিকে শুধু উঁচু-উঁচু শালগাছ। ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এই শালবন যেন প্রকৃতির গোপন রহস্যে ঘেরা। এই বনভূমি সরকারের রির্জাভ ল্যান্ড ফরেস্ট হিসেবে সংরক্ষিত। প্রাকৃতিক এই বনভূমির মাঝে নেই কোনও কৃত্রিমতা।
কথিত আছে, পালযুগে পালবংশের কোনও এক রানি শালবনটি দেখতে এসেছিলেন। রানিকে কাছে পেয়ে সেখানকার প্রজারা তাদের জল কষ্টের কথা জানান। কোমলপ্রাণ রানি প্রজাদের ওই কষ্টে ব্যথিত হয়ে সেখানে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। এটির নামকরন করেন আলতাদিঘি। বুনোপথ ধরে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখা মিলবে শালবনের মাঝে বিশাল টলটলে জলের আলতাদিঘি। দিঘির চারপাশে ঝোঁপঝাঁড়। প্রকৃতি এখানে নিজ হাতে যেন সবকিছু সাজিয়েছে।
আরও কথিত আছে, এক সময় শালবনটির মালিক ছিলেন কলকাতার পাথর ঘাটার জমিদার অত্যানন্দ ঠাকুর। তিনি দৈবক্রমে অন্ধ হয়ে যান। ফলে তার স্ত্রী অক্ষয় কুমারী দেবী জমিদারি পরিচালনা করতেন। উপজেলার আড়ানগরে তাদের কাছারি বাড়ি ছিল (বর্তমানে বাড়িটি তহশিল অফিস হিসেবে ব্যবহ্নত হচ্ছে)। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে প্রতি বছর ৩০ চৈত্র পরিপক্ক শালগাছগুলো নিলামে বিক্রি করতেন। জমিদারের কর্মচারীরা আগেই পরিপক্ক গাছগুলো চিহ্নিত করে রাখতেন। দূর-দূরান্ত থেকে কাঠ ব্যাসায়ীরা প্রকাশ্যে ওই নিলামে অংশ নিতেন। অক্ষয় কুমারীরর উপস্থিতিতে ১৯৪৭ সালে শেষবারের মতো নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে আর সেখানে ওই জমিদারের কেউ আসেননি।
শালবনের মাঝে জায়গা করে নিয়ে বড় বড় ঢিবি গড়ে তুলেছে উই পোকা। যা নিজের চোখে দেখলেও কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না এটা উই পোকার ঢিবি। লালচে রঙ্গের এই ঢিবিগুলো প্রবল বর্ষণেও নষ্ট হয় না। উই পোকারা নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় সারা বছর। শালবনে বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতার জন্য ২৪ জন নিয়োজিত রয়েছে।
বর্তমানে এটি পর্যটন কেন্দ্র না হলেও প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসে। প্রকৃতির বনভূমি শালবনে কোনও বিশ্রমাগার না থাকলেও বনের উত্তর ধারে অনেকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। যারা বেড়াতে আসেন তারা এই ফাঁকা জায়গায় বসে নির্মল বাতাসে আরাম করেন।
বেড়াতে আসা পর্যটক আব্দুর রহিম বলেন,এই স্থানটির কথা আমি বহুবার শুনেছি কিন্তু আসা হয়নি। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না জেলায় এত সুন্দর একটি শালবন রয়েছে।
ধামইরহাট উপজেলার দায়িত্বে থাকা বনবিট কর্মকর্তা লক্ষণ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, বরেন্দ্র ধামইরহাট শালবন পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ শীর্ষক প্রকল্পের জন্য ২০১১-১২ অর্থ বছরে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এরইমধ্যে ১৭০ হেক্টর জমিতে ৬৮ হাজার ওষুধি গাছ ও বেত বাগান করা হয়েছে। তাছাড়া জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য এখানে অজগর সাপ ২টি, মেছোবাঘ ৮টি, বনমোরগ ১৪টি, গন্ধগকুল ২টি অবমুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই উপজেলা প্রকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। প্রতিদিন এই শালবন দেখার জন্য শত শত লোকজন আসে। আশা করছি অতি দ্রুত এই জাতীয় উদ্যানের কাজ শুরু হবে। এটি হলে এলাকার চেহারাই পাল্টে যাবে।
আরও পড়তে পারেন: আড়ালেই থেকে যাচ্ছে ‘ক্রসফায়ারে’র মূল গল্প
/জেবি/এমএনএইচ/








