বগুড়ার তিনটি সরকারি কলেজে ছাত্রলীগের ভর্তি বাণিজ্য

বগুড়া প্রতিনিধি
৩০ জুন ২০১৬, ২১:২০আপডেট : ৩০ জুন ২০১৬, ২১:২২

বগুড়া বগুড়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তিনটি সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বগুড়া জেলা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি কিবরিয়া হোসেন অভিযোগ করেন, একাদশ শ্রেণিতে অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তি প্রক্রিয়ায় কলেজ প্রশাসন ছাত্রলীগের যোগসাজসে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সরকারি মজিবুর রহমান মহিলা কলেজ ও বগুড়া সরকারি কলেজে টাকা ছাড়া ছাত্রলীগের নেতারা ভর্তি হতে দিচ্ছেন না। খতিয়ে দেখে এসব অভিযোগের সত্যতা তারা পেয়েছেন। বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি বাণিজ্য হলেও সেটা দৃশ্যমান নয় বলে জানান ছাত্রফ্রন্টের এই নেতা।
তিনি আরও জানান, বগুড়ার মহিলাসহ কয়েকটি কলেজ ও খুলনার সুন্দরবন কলেজে ছাত্রলীগের ভর্তি বাণিজ্যের প্রতিবাদে শহরের সাতমাথায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
বগুড়া সরকারি কলেজে ছাত্রলীগ নেতা নামধারী জনৈক আল-আমিন ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এই ভর্তি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে ওইসব নেতা ও অধ্যক্ষরা দাবি করেন, যেহেতু ভর্তি কার্যক্রম অনলাইনে ও সিওর ক্যাশে পরিশোধের মাধ্যমে হয়, এখানে বাণিজ্য করার কোনওও সুযোগ নেই। প্রতিপক্ষের কেউ ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

অভিযোগকারীদের কাছ থেকে জানা গেছে, অপেক্ষমান তালিকার সকল ফরম এখন দলীয় নেতাদের হাতে এবং টাকা ছাড়া কেউ ভর্তি হতে পারছেন না। কোনও কোনও কলেজে অধ্যক্ষও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।

জানা গেছে, চলতি ১৬ জুন থেকে কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মেধা তালিকায় ভর্তির কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে। অপেক্ষমান তালিকার ভর্তি শুরু হলেই সরকারি শাহ্ সুলতান, সরকারি মজিবর রহমান মহিলা কলেজ ও বগুড়া সরকারি কলেজে (সাবেক বাণিজ্যিক মহাবিদ্যালয়) ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল নেতারা ভর্তি বাণিজ্য শুরু করেন। ভর্তি ফরমগুলো তাদের হাতে। নেতারা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার কমে কাউকে ভর্তি হতে দিচ্ছে না। কোনও কোনও অধ্যক্ষ নেতাদের এ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুন) শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে গিয়ে অফিসে ঢুকতে পারেননি। নেতারা ভর্তির তারিখ পেরিয়ে যাওয়াসহ নানা অজুহাতে অফিসে তাদের ঢুকতে দেননি। ভর্তির বিনিময়ে তাদের কাছে ৬-৭ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে বগুড়ার শিবগঞ্জের আমতলি গ্রামের ছাত্রী সীমা খাতুন (সিরিয়াল নং-৩৫৮, বিজ্ঞান) ভর্তি হবার জন্য বড় বোনের সঙ্গে কলেজে আসেন। সেখানে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা অফিস রুমে ঢুকতে দেননি।

ছাত্রীর বোন অভিযোগ করেন, নেতারা তাদের কাছে ৬ হাজার টাকা দাবি করেন। তিনি পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে অধ্যক্ষের কাছে গেলে তাকে বিকাল ৪টার দিকে ভর্তির জন্য আসতে বলা হয়। অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. নুরুন্নবী তার কলেজে ভর্তি বাণিজ্যের কথা দৃঢতার সঙ্গে অস্বীকার করে বলেন, ১৮ জুন থেকে ভর্তি শুরু হয়েছে, কেউ তার কাছে এমন অভিযোগ করেননি। তিনি নিজেও এর সঙ্গে জড়িত নন।

সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজে ১২৫০ আসনের এ কলেজে গত ২৪ জুন ভর্তি শুরু হয়। এ কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি বিশ্বজিৎ সাহা অপেক্ষমান তালিকার সকল ভর্তি ফরম নিজের কাছে রেখেছেন। তিনি বা তার প্রতিনিধিকে ২০ হাজার টাকা না দিলে কেউ ভর্তি হতে পারছেন না। এতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অধ্যক্ষ প্রফেসর এজাজুল হক জানান, তার কলেজে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তি করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ছাত্রলীগের কোনও নেতার ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ তিনি পাননি।

কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি বিশ্বজিৎ সাহা ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভর্তির কথা দৃঢতার সঙ্গে অস্বীকার করে বলেন, এখন ভর্তি অনলাইনে এবং টাকা সিওর ক্যাশের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। ভর্তি নিয়ন্ত্রণ করছেন কলেজের শিক্ষক পরিষদ। তাই ভর্তি বাণিজ্যের সুযোগ নেই। প্রতিপক্ষের লোকজন মিথ্যাচার করছেন।

অপরদিকে সরকারি মজিবুর রহমান মহিলা কলেজে ছাত্রলীগের সভাপতি আঞ্জুমান আরা, সাধারণ সম্পাদক রত্না সরকার, যুগ্ম সম্পাদক রুকাইয়া সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক সুমি খাতুন প্রমুখ নেত্রী ব্যাপক ভর্তি বাণিজ্য করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের টাকা না দিয়ে ভর্তি হবার সুযোগ নেই। নেত্রীরা সাংবাদিকদের কাছে ভর্তি বাণিজ্যের কথা স্বীকার করে বলেন, শুধু তারা নন; তাদের সংগঠনের নাম ভেঙে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারিরাও টাকা নিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ কলেজে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক শাখায় ১ হাজার ২৫০টি আসন।

১৬ জুন মেধা তালিকা থেকে ভর্তি করা হয়। ২৪ জুন প্রথম অপেক্ষমান ও ২৭ জুন দ্বিতীয় অপেক্ষমান তালিকার ভর্তির তারিখ ছিল। ওই দিন ছাত্রীরা ভর্তির জন্য কলেজে গেলে তাদের ফরম দেওয়া হয়নি। ২৮ জুন আসনের চেয়ে বেশি আসনে ভর্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়। ছাত্রলীগ নেত্রীরা ভর্তির বিনিময়ে জনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। গত বুধবার বিপুল সংখ্যক ছাত্রী ভর্তির জন্য কলেজে আসেন। কিন্তু অফিস থেকে ভর্তি ফরম দেওয়া হয়নি। অধ্যক্ষ হোসেন শহিদ মাহবুবুর রহমান কলেজে তার রুমে ছিলেন না।

অধ্যক্ষের খাস কামরায় ছাত্রলীগ নেত্রী রত্না সরকারসহ ৫ নেত্রী ভর্তির ফরম নিয়ে বসেছিলেন। বাহিরে থাকা এক নেত্রী অভিভাবক ও ছাত্রীদের কাছে ভর্তির বিনিময়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা কেন দিতে হবে অভিভাবকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে নাম প্রকাছে অনিচ্ছুক ওই নেত্রী বলেন, ফরম সব বড় আপুদের কাছে। টাকা ছাড়া ভর্তি সম্ভব নয়।

অপেক্ষমান তালিকায় থাকা মোস্তাকিমা জান্নাত নামে এক ছাত্রী (বিজ্ঞান, সিরিয়াল-৫৮৩) অভিযোগ করেন, গত ২৮ জুন তার ভর্তির কথা ছিল। কিন্তু কলেজ থেকে সেদিন কোনও ফরম দেওয়া হয়নি। কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক রুকাইয়া সরকার তার কাছে ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তাকে ভর্তি করা হবে।

ওই নেত্রী সাংবাদিকদের কাছে এ টাকা নেতার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এটা নিজের জন্য নয়; নিয়েছেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের জন্য। তারা টাকা পেলেই ভর্তির ফরম দিবেন।

সরকারি মজিবুর রহমান মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ সাংবাদিকদের কাছে ছাত্রলীগ ও কলেজ প্রশাসনের ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করেছেন।

এ বিষয়ে বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাইমুর রাজ্জাক তিতাস এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ভর্তি বাণিজ্যসহ অসাংগঠনিক কার্যকলাপের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগ সরকারি মজিবুর রহমান মহিলা কলেজের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। এছাড়া অন্যান্য কলেজের নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে অব্যাহতি
/এইচকে/আপ-এআর/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এক দিনেই ৭০০ তিমি ও ডলফিন হত্যা
এক দিনেই ৭০০ তিমি ও ডলফিন হত্যা
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান