জেএমবি (দক্ষিণ) আমিরের সিরাজগঞ্জের বাড়িতে ছিল সন্দেভাজনদের আনাগোনা!

আমিনুল ইসলাম রানা, সিরাজগঞ্জ
২২ জুলাই ২০১৬, ১৫:৪৭আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৬, ১৬:১৩

টঙ্গীর চেরাগআলীতে র‌্যাবের অভিযানে জিহাদি বই ও অস্ত্রসহ আটক নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতুল মুজাহিদিন অব বাংলাদেশ (জেএমবি)’র দক্ষিণাঞ্চল আমির মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসান ওরফে তানভীরের (২৭) সিরাজগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে সন্দেভাজনদের আনাগোনা ছিল বলে জানা যায়। বৃহস্পতিবার রাতে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের রশিদপুর গ্রামে গেলে মিডিয়াকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের কাছে এমন তথ্য প্রদান করেন গ্রামবাসী।

জেএমবি দক্ষিণের আমির মাহমুদুল হাসান

জেএমবি দক্ষিণের আমির মাহমুদুল হাসান, তার বড় ভাই আব্বাস আলী ও বাবা বাবর আলী গত এক বছর থেকে গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। হাসানের মা ময়না বেগম। ছোট ভাই আজাদুর রহমান রশিদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। মা ও ছোট ভাই গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন। বৃহস্পতিবার র‌্যাবের হাতে জেএমবি দক্ষিণাঞ্চল আমির মাহমুদুল আটক হওয়ার পর মিডিয়ায় খবর প্রচার হবার পরপরই সন্ধ্যায় মা ও ছোট ভাই আজাদ লুকিয়ে পড়ে। গভীর রাতে পুলিশ সদস্যরা যখন তাদের বাড়িতে অভিযান পরিচালিত করেন, তখন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বাড়িটি একেবারেই নির্জন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অভিযান ও গ্রামবাসীর আলোচনায় বিশেষ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে জঙ্গি হাসানের বিরুদ্ধে।

জেএমবি দক্ষিনাঞ্চল আমির মাহমুদুল হাসানের পারিবারিক তথ্য:

দাদা কোরবান আলী ভূঁইয়া পেশায় কৃষক ছিলেন। তিনি প্রায় এক বছর আগে মারা গেছে। তার ৫ ছেলে। সোবহান, বাবর, বাবলু, লতিফ ও রফিকুল। লতিফ মারা গেছেন। বাকিরা কৃষিকাজ, মুদি দোকানদার ও শ্রমিক পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন। হাসানের বাবা বাবর আলী ভাইদের মধ্যে মেজো। প্রায় এক যুগ আগে চট্টগ্রামে স্টিল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এরপর গ্রামে এসে মুদিদোকানি এবং গত কয়েক বছর সিরাজগঞ্জের বিসিক শিল্প এলকায় একটি স্টিল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

এক বছর আগে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের দল রশিদপুরে সন্দেভাজনদের ধরতে এলে বাবুর আলী বড় ছেলে আব্বাস আলী এবং মেজো ছেলে মাহমুদুল হাসানসহ গা-ঢাকা দেয়। ঈদেও তারা কেউ বাড়িতে আসেনি। হাসানের মা ও ছোট ভাই গ্রামে থাকতেন। তাদেরও খোঁজ নেই।

জেএমবি দক্ষিণাঞ্চল আমির মাহমুদুল হাসানের জঙ্গি সম্পৃক্ততার তথ্য:

উল্লাপাড়ার সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের রশিদপুর গ্রামে থেকে অর্থাভাব সত্ত্বেও এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর হাসান যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবি পুলিশের ওসি ওয়াহেদুজ্জআমান ও সলঙ্গা থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান র‌্যাব ও গ্রামবাসীর উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, বিশ্বদ্যিালয়ে পড়া অবস্থায় হাসান জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

এক বছর আগে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ হাসানের এক সহযোগীকে আটকের পর তাকে নিয়ে রশিদপুর গ্রামে অভিযান চালায়। এরপর থেকেই বাবুর আলী ও দু’ছেলেসহ গা-ঢাকা দেয়।

জঙ্গি হাসান সম্পর্কে গ্রামবাসী যা বললেন:

বৃহস্পতিবার রাত ১০ টা। রশিদপুর গ্রামে ঢুকতেই ত্রি-মোহনী মোড়ে করিম মিয়ার চা-য়ের দোকান। এত রাতেও সেখানে বেশ সরগম। সকলের দৃষ্টি টেলিভিশনের দিকে। ডিসের লাইন বিকেল থেকে বিভ্রাট থাকায় গ্রামবাসীরা জঙ্গি হাসানের আটকের খবর ঠিকমতো শুনতে না পেয়ে অনেকেই টিভির পর্দায় চোখ রেখে চা পানে সময় কাটাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও মিডিয়াকর্মীদের দেখে তারা সটকে পড়তে যাচ্ছিলেন। তাদের অভয় দিয়ে অনুরোধ করে ঠেকানো হলো।

সিংগড়া ও পিয়াজু ফেরী করে বিক্রেতা রশিদপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল লতিফ মজনু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থায় হাসানের গ্রামের বাড়িতে প্রায়ই বেশ কিছু বন্ধু আসতেন। তাদের আনাগোনার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের কাছে গত বছর খবর গেলে অভিযান চালায়। লতিফ আরও বলেন, হাসান সম্পর্কে খুব একটা জানতাম না। দূরে পড়াশোনা করতো। মাঝেমধ্যে এলে সবার সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করতেন না। এলাকায় এসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন।

শুক্রবার এলাকার মসজিদে জুম্মার নামাজ ও খুতবাও পাঠ করতেন। দিনের পথে আসার তাগিদ দিতেন গ্রামবাসীকে। চা দোকানদার করিম বলেন, আমরা সকালে টিভিতে তার আটক ও জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা শুনে হতবাক হয়েছি। হাসানরা গরীব মানুষ। গ্রামের বাড়িতে তার মা ছোট ভাইকে নিয়ে খুব কষ্টে থাকেন। আমরা ভেবেছিলাম পড়াশোনা শেষে তিনি চাকরি খুঁজছেন। যে যেমন কর্ম করবে, সে তেমন ফল ভোগ করবে, এটাই স্বাভাবিক।  

আরও পড়ুন: সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে দাড়ি কেটে ফেলছে জেএমবি সদস্যরা

জঙ্গি হাসান সম্পর্কে স্বজনরা যা বললেন:

বৃহস্পতিবার রাতে যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাসানের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেন। তখন হাসানের মৃত চাচা লতিফ ভূঁইয়ার স্ত্রী তাসলিমা খাতুন বলেন, আমরা গ্রামের মানুষ অতো কিছু জানি না। সন্ধার কিছু আগে হাসানের মা ময়না বেগম ও ছোট ভাই আজাদুর রহমানকে নিয়ে কোথায় গেছেন, তা আমরা জানি না। হাসান, তার বড় ভাই আব্বাস ও বাবা বাবর আলী গত এক বছর হলো বাড়িতে আসে না। হাসানের মা খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।

জঙ্গি হাসান সম্পর্কে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যা বললেন:

সিরাজগঞ্জ ডিবি পুলিশের ওসি ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, হাসানের পরিবারের সকলকে দুঃস্থ মনে হয়েছে।

পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, হাসান যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যায়নরত অবস্থায় জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। জেলায় এ পর্যন্ত নিখোঁজ ১৯ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজ সকলেই যে জঙ্গি তা নয়। তাই নিখোঁজ বিষয়ে আরও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।

/এইচকে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আদ দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নাকি ত্রুটি সংশোধন, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
আদ দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নাকি ত্রুটি সংশোধন, কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
দায়িত্ব ছাড়া প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়া প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেফতার ২
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরি, গ্রেফতার ২
কর্মকর্তাদের কলম বিরতির নির্দেশনা নেই: ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি
কর্মকর্তাদের কলম বিরতির নির্দেশনা নেই: ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী